বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে ২০২২ - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে ২০২২

ড. আতিউর রহমান : মহাকালের বিচারে একটি বছর নিতান্ত নগণ্য। তা সত্ত্বেও ২০২১ শেষ করে ২০২২ সালের শুরুতে এসে গেল বছরে আমাদের জাতীয় জীবনের চাওয়া-পাওয়াগুলোর একটি মূল্যায়ন জরুরিই মনে করি। বাংলাদেশের জন্য এ রকম মূল্যায়ন সম্ভবত আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। করোনা মহামারী, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ‘নিউ-নরমাল’ বাস্তবতা, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন ইত্যাদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিবেচনার জায়গা থেকে তো বটেই, এসবের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কারণে এ সময়টির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনস্বীকার্য। ২০২১-এর চ্যালেঞ্জগুলো আমরা কীভাবে মোকাবিলা করেছি, শেষ হয়ে যাওয়া বছরটিতে আমাদের অর্জনগুলো কী কী এবং সর্বোপরি আসছে ২০২২-এর কাছে আমাদের প্রত্যাশাগুলোই বা কী- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সমৃদ্ধ ও নিরাপদ আগামীর পথনকশা তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেমন গেল ২০২১? সার্বিক বিচারে আমার মনে হয় নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বছরটি ভালোভাবেই শেষ করেছে বাংলাদেশ। বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে যদি বিচার করি তা হলে বলতে হয়, এ বছরটিতে আমাদের সাফল্যের পাল্লাটিই বেশি ভারী। চ্যালেঞ্জ তো ছিলই। সেগুলো মোকাবিলাও করা হয়েছে দক্ষতার সঙ্গে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনমনে বেশ চাপ অনুভব করতে দেখা গেছে। আলাদা করে বলা যায় দ্রব্যমূল্যের চ্যালেঞ্জের কথা। করোনা মহামারীর পর বিশ^বাজার ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করায় হঠাৎ করেই জ¦ালানি তেলের মূল্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। পণ্য-পরিবাহী জাহাজের ভাড়াও হঠাৎ বেড়েছে। একই সঙ্গে বহুদিন স্থবির থাকার পর আমাদানি প্রবাহতেও আকস্মিক গতি সঞ্চারিত হয়েছে। পুরো সাপ্লাই সাইডেই আরও নানারকম প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। সত্যি বলতে অসাধু ব্যবসায়ীরাও এই সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়েছেন। ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। জনগণ বিশেষত যারা সীমিত আয়ের পরিবার- তারা একটু বেশি চাপে পড়েছেন। চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও আমদানি করা নিত্যপণ্যের দাম অনেকটাই বেড়েছে। অথচ আয় তেমনটা বাড়েনি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। তাই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। মানুষকে অনেক ভেবেচিন্তে চলতে হচ্ছে। ডলারের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের একটা ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আমদানির গতি যত বেড়েছে, রপ্তানি সেভাবে না বাড়ায় এবং বছরের শেষদিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে একটু কমতি দেখা দেওয়ায় ডলারের দাম বেড়েছে। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তিটি যথেষ্ট মজবুত হওয়ায় এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সামাল দিতে সময়োচিত সরকারি উদ্যোগ থাকায় এ ধাক্কা অনেকখানি সামাল দেওয়া গেছে ইতোমধ্যেই। নতুন বছরের প্রথমার্ধের মধ্যে (অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের মধ্যেই) এই সংকট বহুলাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে। তবে বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাটা ভালো হবে। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদে সংকট থেকেই যাবে।

২০২১ সালে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আকস্মিকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে এহেন সাম্প্রদায়িক আক্রমণ সত্যিই হতাশার। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার যারা ঘোর বিরোধী সেই দেশি-বিদেশি অপশক্তিগুলো এ রকম ঘটনার সুযোগ নিয়ে নতুন করে দেশবিরোধী চক্রান্ত করতে চাইবে। কাজেই সাম্প্রদায়িকতাকে শক্তভাবে মোকাবিলা করে এই সর্বনাশা বিষবৃক্ষকে অঙ্কুরেই শেষ করা চাই। আশার কথা সরকার সে পথেই হাঁটছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে শুরু থেকেই আপসহীন আছেন। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনা এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকন্যার আপসহীনতাই আমাদের মূল ভরসার জায়গা। বৈরী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে আমাদের সামাজিক পুঁজির অনেকটাই ক্ষয় হয়েছে- সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকারের সঙ্গে সুধীসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে প্রজন্মকে গড়ে তুলতে পারলে সামাজিক পুর্ঁজিকে আবারও আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই সম্ভব। আমরা সেদিকেই এগোচ্ছি। নতুন বছরে এই অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে তেমনটিই আশা রাখি।

Print Friendly, PDF & Email