তালেবান বাহিনীর রণকৌশল - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

তালেবান বাহিনীর রণকৌশল

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন : আগস্ট ১৫, ২০২১ সাল আফগান ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় শুরু হয়েছিল, প্রায় বিশ বছর কাবুল হতে বিতাড়িত তালেবানদের প্রায় ১৫ হতে ১৬ দিনের মাথায় কাবুলসহ আফগানিস্তান দখল। এত তাড়াতাড়ি কাবুলে তালেবানরা পৌঁছবে তা শুধু কাবুলসহ বিশ্ববাসীই নয় ২০ বছর যুদ্ধে জড়িত যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো, বিশ্ববাসীসহ খোদ তালেবানরাও বিশ্বাস করতে পারেনি। মার্কিন এবং তালেবানদের মধ্যে ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০ দোহা চুক্তি হয় যা পরে জাতিসংঘ দ্বারা স্বীকৃত হয়। স্মরণযোগ্য এ চুক্তি ওই সময়ে কাবুলের আশরাফ ঘানি সরকারকে বাইরে রেখেই হয়েছিল। তার মানে যে এ চুক্তি বাস্তবায়নে কথিত নির্বাচিত এবং মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী সমর্থিত তৎকালীন কাবুল সরকারের কোনো ভূমিকাই ছিল না।

প্রকৃতপক্ষে চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে এত দিনের প্রতিপক্ষ ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যায়িত তালেবানদের একচ্ছত্র আধিপত্যকেই মেনে নিয়েছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর ১১-এর মধ্যে আফগান হতে সামরিক ও বেসামরিক সদস্যদের ত্যাগ করবার কথা ছিল যা ৩০ আগস্ট ২০২১ মধ্যরাতে সম্পন্ন হওয়াতে তালেবানরা সম্পূর্ণ আফগানিস্তানের হর্তাকর্তায় পরিণত হয়েছে। আগস্ট ১৫তে হয়তো তালেবানরা কাবুলে প্রবেশ করত না, যদিও ঘেরা দিয়ে রেখেছিল, যদি দুটি ঘটনা না ঘটত।

প্রথম আশরাফ ঘানি, রাষ্ট্রপতি এবং তার ক্যাবিনেটের বহু সদস্য পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে না যেত; দ্বিতীয় তালেবানরা আরও কিছু দিনের জন্য কাবুল ধরে রাখতে অনুরোধ করেছিল বিশেষ করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তর না করা পর্যন্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র অনিশ্চিত অবস্থায় বিশেষ করে নিরাপত্তার হুমকির কারণে রাজি হয়নি, যার প্রমাণ অবশ্যই ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং ১৭০ জন আফগান কথিত আইএস (কে)-এর আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয়েছিল।

যাই হোক এ মুহূর্তে ২০ বছর যুদ্ধের পর তালেবানরা পুনরায় কাবুলে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এবং এবার, দৃশ্যত, প্রথমেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের স্বীকৃতি পেতে চলেছে। এমনকি অবশেষে ভারতও এই পথে হাঁটবে।

তথ্য মতে যুক্তরাষ্ট্র ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্য (ইউকে) ৩৭ বিলিয়ন ডলার যার মধ্যে প্রায় ১৮৭ বিলিয়ন শুধু আফগান ন্যাশনাল সেনাবাহিনী এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করতে খরচ করেছিল। তথ্য মতে প্রায় ৩ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৈরি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের একপ্রকার বদ্ধধারণা ছিল অন্তত ছয় মাস এই বাহিনী আফগানিস্তান ধরে রাখতে পারবে কিন্তু তেমন হয়ইনি। তাসের ঘরের মতো পড়ে গেল এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এখন তালেবানদের হাতে। নতুনভাবে সজ্জিত দেখা যাচ্ছে তালেবানদের। বিশেষ করে ‘স্পেশাল ফোর্স’-অক-৪৭-এর জায়গায় এম-৪ এসল্ট রাইফেল।

আফগানিস্তানে এমন বিপর্যয়ের পর ন্যাটোসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর কাটতে সময় লাগবে। প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র তথা পেন্টাগন কি আফগানিস্তানের ইতিহাস বা সমাজব্যবস্থা সম্বন্ধে পূর্বজ্ঞান নিয়ে এ ধরনের অভিযানে নেমেছিল? না শুধুমাত্র গায়ের জোরে নেমে তালেবানদের রণকৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছিল। তালেবানরা তাদের সামাজিক ব্যবস্থা, ইতিহাস ভূমি বিন্যাস, তাদেরই দেশ, সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ওয়াকিবহাল যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রায় অন্ধকারে ছিল যার কারণে নির্ভর করতে হয়েছে স্থানীয় গাইড এবং দোভাষীদের ওপর। এদিক থেকে ব্রিটিশরা এগিয়ে কারণ তাদের পূর্বঅভিজ্ঞতা থেকে প্রচুর গবেষণা এবং পড়াশোনা রয়েছে। ফ্রান্সেরও থাকবার কথা। বহু ব্রিটিশ গবেষকের আফগানদের বিবরণ বহু গবেষণাকর্ম এখনো পঠিত।

এখানে কয়েকটি বইয়ের উল্লেখ করব এবং সন্দেহ রয়েছে যে পেন্টাগন আফগানিস্তানের যুদ্ধ শুরুর আগে কৌশল তৈরিতে নিয়োজিত কমান্ডাররা পড়েছিল কিনা? এসব গবেষণাকর্ম উল্লিখিত বইয়ের প্রথমটি হলো ‘হিস্টোরি অব আফগানিস্তান’ গবেষণাধর্মী ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত। এর লেখক ছিলেন ফরাসি জেনারেল জেপি ফেরিয়ার (ঔচ ঋবৎৎরবৎ) এ বইটি ১৮৩০ সালের দিকে রচিত যার ইংরেজি অনুবাদ হয়ে প্রকাশ হয়েছিল ১৮৫৮ সালে। এখানে আফগানিস্তানের সমাজব্যবস্থা, বিদেশিদের প্রতি তাদের ঘৃণা, যুদ্ধবাজ সংস্কৃতি, অত্যন্ত রক্ষণশীল সমাজ, গর্বিত, বহু উপজাতি ও একগোষ্ঠী জাতি (ঈষধঁ) এবং তাদের চারিত্রিক বৈষষ্ট্যের কথা লিখে ব্রিটিশ উপনিবেশক শক্তিকে সাবধান করেছিলেন।

দ্বিতীয় বইটি বিংশ শতাব্দীতে রচিত এবং ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত স্যার ওলেফ ক্যারোর (ঝরৎ ঙষবভ ঈধৎড়ৎব) বিশ্বখ্যাত বই ‘দি পাঠানস : ৫৫০ বিসি-১৯৫৭ এডি’ যা তিনি নিজের গবেষণা এবং জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় তরুণ ব্রিটিশ কর্মকর্তা হতে ১৯৪৭ পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কাটিয়েছেন। তিনি ওই প্রদেশেই শেষ ব্রিটিশ গভর্নর ছিলেন। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পশতুনসহ অন্যদের সামাজিক ও চারিত্রিক বৈশেষ্ট্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনিও জেপি ফেরিয়ারের মতো বলেছেন বহু উপজাতি এবং গোষ্ঠীতে বিভক্ত হলেও এরা নিজেদের গোত্রের এবং নেতাদের প্রতি অনুগত। কোনোভাবেই বিদেশিদের টিকতে দেয়নি। এর পরের উল্লেখযোগ্য বই ২০১৩ সালে প্রকাশিত উইলিয়াম ডালরিমপল রচিত ‘দি রিটার্ন অব দি কিং : দি ব্যাটল ফর আফগানিস্তান ১৮৩৯-১৮৪২’।

এখানেও আফগানদের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস এবং উপজাতি গোষ্ঠীর সামাজিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে রচিত হয়েছে। এমন আরেকটি বই প্রত্যক্ষদর্শীর ডায়েরি হতে নেওয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় সদস্য সীতারাম রচিত ‘সিপাহি ট্যু সুবেদার’ও দ্রষ্টব্য। এগুলোই শেষ নয় আরও বহু গবেষণা রয়েছে। এ কয়টি ঐতিহাসিক বইয়ের কথা লিখবার একমাত্র কারণ হলো কথায় বলে ‘ইতিহাস হতে কেউ শিক্ষা নেয় না’ তারই উদাহরণ দিতে। আমার সন্দেহ যে পেন্টাগন অথবা তাদের অপারেশনাল জেনারেলরা এ কথা কতখানি মনে রেখেছিল। ব্রিটিশরাও মনে রেখেছিল কিনা তাদের ৪৪তম ব্যাটালিয়নের নাস্তানাবুদ হওয়ার ইতিহাস (দি কুইন’স ল্যাঙ্কাশায়ার রেজিমেন্টের অংশ)।

তালেবানদের রণকৌশল প্রসঙ্গে যাওয়ার পূর্বে বলে রাখা ভালো যে, আফগানিস্তান ১৭৪৭ সালের আগে কোনো একক রাষ্ট্র ছিল না। শত শত গোত্রে বিভক্ত ছিল আজও তেমন রয়েছে। পশতুনদের মধ্যে ৬০টি প্রধান উপজাতি এবং ৪০০ গোষ্ঠী রয়েছে। রয়েছে ২৩ শতাংশ তাজেক ৭ শতাংশ উজবেক ও বাকি অন্যরা। সব উপজাতির মধ্যেই অনুরূপ বিভাজন গোত্রের নেতাদের নেতৃত্ব। আজও কোনো পরিবর্তন হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা অতীত হতে শিক্ষা না নিলেও তালেবানরা ২০০১ সালে হতে শিক্ষা নিয়েছে। বিধ্বস্ত তালেবানরা ২০০৫ সাল হতে কোয়েটা শূরার মাধ্যমে পুনর্গঠিত হওয়া শুরু করে এক বছরের মাথায় দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতে বিভিন্নভাবে যুদ্ধ শুরু করে এবং ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ আফগান ভূখ-ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। যদিও বড় শহরে তাদের দখল ছিল না। তবে ৪২১টি জেলার ৬০ ভাগে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ আফগানরা ঘানি সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি এবং দখলদারদের অত্যাচারের কারণে তালেবানদের সমর্থন দিতে থাকে।

ওই সব অঞ্চলে গরিব কৃষকদের তালেবানরা অর্থ সাহায্য হতে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার বিচারব্যবস্থার পরিবর্তে বিনামূল্যে ত্বরিতগতিতে ছোটখাটো মামলা এমনকি হত্যা মামলা, ভূমিদখল এবং চুরি-ডাকাতির মতো ঘটনার বিচার করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিল। অপরদিকে গুরুত্বপূর্ণ গ্রামভিত্তিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি পুলিশসহ মাসোহারার ব্যবস্থা করেছিল। এক কথায় তালেবানরা সামাজিক দুরবস্থা এবং সরকারের দুর্নীতি ও অপশাসনের পূর্ণ সুযোগ নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল।

বিশেষজ্ঞ গবেষকরা মনে করেন তালেবানরা চীনা সামরিক দার্শনিক শন জু (ঝঁহ ঞুঁ)-এর ‘আর্ট অব ওয়ার’ সম্বন্ধে তেমন ওয়াকিবহাল না হলেও তার জয়ের তত্ত্ব ব্যবহার করেছে যার মধ্যে প্রধান তত্ত্ব সামাজিক অবস্থার ব্যবহারের এবং একই সাথে সামরিক শক্তির বিভিন্ন উপায় ব্যবহার। শত্রু শিবিরে আতঙ্কা ছড়ানো।

মনে রাখতে হবে যে, ২০১৭ সালের তালেবান ২০০১ সালের তালেবান নয়। বেশিরভাগ শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব পরবর্তী প্রজন্মের হাতে যদিও ওই সময়কার বেশ কিছু তরুণ সদস্য বর্তমানে পরিপক্ব ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বে রয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে তরুণ প্রজন্মের হাতে ছিল সামরিক অভিযান। এখনকার তালেবানরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলে ছিল। শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, ‘জয়ের তত্ত্বে’ অত্যন্ত বিশ্বস্ততা এবং আনুগত্যের সাথে কৌশলগত নির্দেশ পালন করে গেছে। সমাজের এ অব্যবস্থার কারণে নিজেদের পক্ষে কাজ করতে ও তথ্য আদান-প্রদানের জন্য জনগণকে ব্যবহার, অনেকাংশে সরকারের গোয়েন্দাদের ও দোভাষীদের অর্থের বিনিময়ে নিজেদের দলভুক্ত করেছে যাতে প্রতিপক্ষের প্রতি বড় পদক্ষেপ জানতে পারে। এ প্রক্রিয়া ‘শন জু’-এর তত্ত্ব ‘শত্রুকে চিনতে হবে জানতে হবে তার দুর্বলতা’।

তালেবানরা ২০১৫ হতে ২০২০ পর্যন্ত বড় শহর দখল করতে পারেনি বা করবার চেষ্টা করেনি তবে প্রায় সব বড় শহরে বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমের শহরগুলো যেখানে তালেবান ১.০ দুর্বল ছিল সেসব জায়গায় সিøপিং সেল গঠন করে বিভিন্নভাবে তালেবান আক্রমণকে সাহায্য করবার পরিবেশ তৈরি করবার দায়িত্ব ছিল যা ভালোভাবেই পালন করেছিল।

পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল সরকার এবং সরকারি বাহিনী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। তালেবানরা আইইডি (ওঊউ)তে দারুণ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিল যার ব্যবহার সরকার এবং সরকারি বাহিনীকে দারুণ সমস্যায় ফেলেছিল। একইভাবে সামরিক সরবরাহ ও অভিযানের রাস্তায় স্থলমাইন দ্বারা আক্রমণ এবং আত্মঘাতী হামলা সবই ছিল আতঙ্কিত করবার পদ্ধতি। এরই সাথে গুরুত্বপূর্ণ সরকার সমর্থিত অথবা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গোপন হত্যা ছিল আতঙ্কের আরেক নাম। গুপ্তহত্যার প্রধান শিকার হয়েছিল আফগান বিমানবাহিনীর পাইলট এবং কারিগরি সদস্যরা। এক সাথে প্রায় ৭ জন হেলিকপ্টার পাইলটকে হত্যার পর অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছিল। তালেবানদের এ কৌশল ছিল আতঙ্ক ছড়ানোর অব্যর্থ হাতিয়ার।

তালেবানদের অন্যতম কৌশল ছিল ছোট ছোট দলে অ্যামবুশ এবং বিচ্ছিন্ন চেকপোস্টগুলোকে আক্রমণ ও নিষ্ক্রিয় করা। ক্রমেই শহরে সরকারি বাহিনীর ক্যাম্পগুলোকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা। বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি বাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র মোবাইলে আপলোড করে আত্মসমর্পণের আহ্বান করা। অপরদিকে সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করবার ফলে অনেক ক্যাম্পে খাদ্য ও রসদ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকেনি। সময়মতো বেতন না পাওয়ায় স্থানীয় জনগণের শরণাপন্ন হয়েছে। এতে যা হয়েছে তাতে আফগান বাহিনীর মনোবলের ক্রমেই অবনতি ঘটতে থাকে। অপরদিকে সরকারের আকণ্ঠ নিমজ্জিত দুর্নীতির সংবাদ মোবাইলে অহরহ প্রচার করা হতো। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের যার মধ্যে বেসামরিক সরকার ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতি, অদক্ষতা ইত্যাদি এ পরাজয়ের কারণ স্বীকার করে আফগান বাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদাত দি নিউইয়র্ক টাইমসে বিস্তারিত লিখেছেন (The New York Times : Aug 25, 2021)।

২০১৮ সাল থেকে দোহাতে তালেবানদের অফিস দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনাকে ব্যবহার করা হয়েছে এই বলে যে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়ার পথ খুঁজছে। এ সংবাদ তালেবানরা দারুণভাবে ব্যবহার করে যে বার্তা দিয়েছিল তা হলো অবশেষে আফগানিস্তানে তালেবান রাজ কায়েম হতে যাচ্ছে এবং তালেবানরাই এখন শক্তিশালী শক্তি। আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হচ্ছে সব সময়েই শক্তিশালী শক্তির পক্ষে যোগ দিতে উন্মুখ থাকে বিভিন্ন গোষ্ঠী এখানেও তেমনটাই হয়েছে। একই সাথে তালেবানরা অনেক পুলিশ এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্যদের টাকা পয়সা দিয়ে নিজেদের পক্ষে টেনেছে। অবশেষে বাগ্রাম বেস ছাড়বার আগেই তালেবানরা ‘ব্যাটল অব এটরিশনে’ জয়লাভ করে। সর্বশেষে তালেবানদের আক্রমণে জেলা শহরে আত্মসমর্পণ শুরু হয়। এ অভিযান শুরু হয় পূর্বে যেখানে তালেবান দুর্বল ছিল, উত্তরাঞ্চলে। অবশেষে বড় বড় শহরে তালেবানদের বিপুল সংখ্যক স্থানীয় স্লিপিং সেল (Sleeping Cell) চূড়ান্ত অভিযানে ভেতর হতে আক্রমণ করে সরকারি বাহিনীকে দুর্বল করে তোলে। এরই ফল সর্বশেষে কাবুল পতনের সময় দৃশ্যমান হয়েছিল।

এক কথায় তালেবান ২.০ তাদের যুদ্ধের কৌশল যেভাবে পরিবর্তন করেছে তা যে কোনো সমরবিদ এবং গবেষকদের ভবিষ্যৎ ব্যাপক গবেষণার তথ্যউপাত্ত হয়ে থাকবে। তবে তালেবানদের রণকৌশল সম্বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। তার কারণ শত্রুকে অবজ্ঞা করা এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন : নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

Print Friendly, PDF & Email