তালেবান ইস্যু ও ভারতের রাজনীতি - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

তালেবান ইস্যু ও ভারতের রাজনীতি

ড. মাহফুজ পারভেজ : আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখল সারা বিশ্বেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে বিস্মিত করেছে অভাবণীয় দ্রুততায় ও অকল্পনীয় গতিতে তালেবানদের বিজয়ের বিষয়টি। চীন, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি জানিয়েছে তালেবানদের প্রতি। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই তালেবান ইস্যুতে গ্রহণ করেছে ‘অপেক্ষার নীতি’। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে একমাত্র ভারতই তালেবানদের প্রতি কড়া বার্তা জানিয়েছে। ভারতের সরকারের মতোই ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতারা তালেবানদের বিষয়ে সরব। বস্তুত, ভারতের চলমান রাজনীতিতে তালেবান ইস্যু অনেকটাই জায়গা দখল করেছে।

ভারতীয় মিডিয়া, তালেবানরা আফগানিস্তানের দখল নিতেই, সে দেশে হাহাকারের চিত্র তুলে ধরছে।

 

ভারতীয় বিশ্লেষকদের ভাষায়, ‘তিলে তিলে মৃত্যু হচ্ছে মানবাধিকারের।’ এমনকি, ‘বিপন্ন আফগান ভাই-বোনদের বিপদে পাশে থাকার’ বার্তা দিয়েছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারত কূটনৈতিক শক্তিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরব তালেবানদের বিরুদ্ধে।

ভারতের ভেতরেও রাজনৈতিক মাঠে নানাভাবে ও নানা প্রসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে তালেবান ইস্যু। নেতারাও কথায় কথায় দিচ্ছেন তালেবানদের দৃষ্টান্ত। এমনই ঘটনা ঘটেছে মধ্যপ্রদেশে, সেখানে এক বিজেপি নেতার মন্তব্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক সাংবাদিক মোদি শাসনে দেশে মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানির লাগামহীন দাম নিয়ে প্রশ্ন করতেই চটে গেলেন নেতা। চিৎকার করে সাংবাদিককে বলেন, ‘আফগানিস্তান চলে যান, ওখানে পেট্রল সস্তা!’

সেই নেতার নাম রামরতন পায়াল, তিনি মধ্যপ্রদেশের কাটনি জেলার বিজেপি দলের সভাপতি। তাঁর দাবি, ‘দেশে যখন করোনার তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সেই সময় মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি রেগে গিয়ে প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে বলেন, ‘তালেবানের কাছে চলে যাও, পেট্রল আফগানিস্তানে ৫০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। এখানে কেউ এসব জিজ্ঞেস করছে না। অন্তত ভারতে আমরা সুরক্ষিত রয়েছি। ভারত ইতিমধ্যেই দু-দুটো সংক্রমণের ঢেউ দেখেছে, তৃতীয় ঢেউ আসছে।’ বিজেপি নেতার এহেন মন্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

অরুণ ভৌমিকের এহেন বক্তব্য ত্রিপুরার ক্রম-উত্তপ্ত রাজনীতিকে আরো গরম করেছে। অরুণ ভৌমিক বলেন, ‘বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মদতে তৃণমূল নেতারা ত্রিপুরার বিপ্লব দেব সরকারের ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের কাছে আমার আবেদন ওদের উপর তালেবানি কায়দায় হামলা হোক। ওরা বিমানবন্দরে নামলেই ওদের উপর তালেবানি কায়দায় হামলা হোক। প্রতি রক্তবিন্দু দিয়ে আমরা ত্রিপুরায় সরকার রক্ষা করব।‘

দক্ষিণ এশিয়ার পশ্চিম প্রান্তের আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখলে ভারত বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখলেও এবং কড়া প্রতিক্রিয়া জানালেও ভারতেরই নানা প্রান্তে তালেবানদের অনুসরণে আহ্বান সবাইকে বিব্রত করেছে। বিশেষত ক্ষমতাসীন সরকারের নীতিনির্ধারকদের মুখে তালেবানদের কাছে চলে যাওয়ার এবং তাদের কৌশল গ্রহণ করার জন্য দলীয় কর্মীদের প্রতি আর্জি জানানোয় বিস্মিত হয়েছেন বিশ্লেষকগণ। তাদের ভাষায়, ‘মৌলবাদ আসলেই গণতান্ত্রিক ও উদারপন্থী রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য বিরাট বিপদের কারণ। আর সেটা মুসলিম বা হিন্দু কট্টরপন্থী হোক কিংবা আফগানিস্তান বা ভারতে হোক, বিপদের মাত্রা ও গভীরতা একই।’ ফলে বিজেপি বিধায়কদের তালেবান বিষয়ক মন্তব্যে উত্তেজনা বেড়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ এবং বিজেপি বিরোধী অন্যতম মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী জোট পোক্ত করতে নিজেই সমঝেতামূলক বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। মোদি সরকারকে ফেলতে কংগ্রেসের সঙ্গেই বিরোধী জোটে যে অন্যান্য বিজেপি বিরোধী দলও সমান গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। এদিকে, নানা জনমত জরিপেও মোদির জনপ্রিয়তা হ্রাসের পাশাপাশি মমতার প্রতি মানুষের সমর্থনের হার বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিরোধীরা বিভিন্ন সভা, সমাবেশ ও বৈঠকে কৃষক আন্দোলনের প্রসঙ্গ, মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও একনায়কতন্ত্রের অভিযোগ, নাগরিকদের প্রতি বঞ্চনা, পেগাসাস ইস্যু, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে সোচ্চার হওয়ার জবাবে বিজেপির পক্ষ থেকে তালেবান ইস্যু ঘরোয়া রাজনীতিতে নিয়ে আসার বিষয়টিও সবার নজর কেড়েছে।

Print Friendly, PDF & Email