একটি কালো রাত : একজন মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু‌ - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

একটি কালো রাত : একজন মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু‌

কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি : ২৪টি বছর স্বাধীন দেশের জন্য জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে যিনি হয়েছিলেন এদেশের গণমানুষের নেতা, তিনি দেশ গড়ার জন্য সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৩টি বছর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে একদিকে উদয় হচ্ছিলো একটি নতুন ভোরের সূর্য আর অন্যদিকে ডুবে যাচ্ছিলো বাংলাদেশের উজ্জ্বল সূর্য। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঘাতকের বুলেট সেদিন রাঙিয়ে দিয়েছিলো বাংলার জমিন। পূর্ব দিগন্তের রক্তিম আকাশ সেদিন পিতার রক্তে লাল হয়ে উঠেছিলো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাত বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত রাত। যে রাতের কলঙ্কতিলক এখনো বয়ে চলেছি আমরা। স্বাধীন বাংলাদেশে নিজের লোকের হাতে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে জাতির পিতা তা কেউ কল্পনাও করেনি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যে কাজটি করার সাহস দেখায়নি, সেই কাজটিই করেছিলো স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থী একদল সেনাসদস্য। সেদিনও রাত শেষে ভোর হয়েছিলো, কিন্তু সেই ভোরে বঙ্গবন্ধু নামের সূর্যের উদয় হয়নি বাংলাদেশে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আস্থাহীন রাজনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট সন্তান শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, জাতির পিতার ছোট ভাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, শিশু পৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী সেই কালো রাতে নিহত হন।

জাতির পিতাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, সেই নৃশংসতায় জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা না করে তাদেরকে বিভিন্ন দেশে চাকরির সুযোগ করে দেয়া হয়েছিলো। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন না হয় সেজন্য কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন পাশ করা হয়েছিলো। তাদের লক্ষ্য ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু ছিলো না, তাদের লক্ষ্য ছিলো বঙ্গবন্ধু নামের আদর্শের। কিন্তু হত্যাকারীরা জানতো না আদর্শের মৃত্যু নাই।

দীর্ঘ ২১ বছর পরে সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জাতির পিতা হত্যার বিচারকার্য শুরু করেন। বাঙালি জাতি যে কলঙ্ক বয়ে চলেছে সেখান থেকে কিছুটা মুক্তি আসে খুনিদের বিচারের মাধ্যমে।

খুনীরা চেয়েছিলো বাঙালিদের মন থেকে বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব মুছে দিতে। সেজন্যই তারা ছোট্ট শিশু রাসেলকেও হত্যা করতে দু’বার চিন্তা করেনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জার্মানীর নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন-” মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যারা মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।” বাঙালি জাতিকেই পৃথিবীর সামনে সেদিন ঘৃণিত করেছিলো স্বাধীনতার মূল চেতনা পরিপন্থী ষড়যন্ত্রকারীরা।

বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী। খুনীরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে পিতাকে খুন করেছিলো তাতে তারা সফল হতে পারেনি কারণ বঙ্গবন্ধু মিশে ছিলো এদেশের মানুষের সাথে, অস্তিত্বের সাথে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অন্যের পরিপূরক। তাইতো তিনি না থেকেও প্রকটভাবে আছেন আমাদের মাঝে, আমাদের অস্তিত্বের মাঝে, আমাদের আদর্শের মাঝে। যাকে কোনদিনই মেরে ফেলা যাবে না, মুছে ফেলা যাবে না।

“যে মুজিব জনতার, সে মুজিব মরে নাই”। জনতার মুজিবের মৃত্যু নাই। জনতার মুজিব মৃত্যুঞ্জয়ী।

১৫ আগস্ট এলেই আমাদের বুক ভারী হয়ে ওঠে। পিতা হারানোর যন্ত্রণা তীব্রভাবে আঘাত করে আমাদের অস্তিত্বে। কতটা নৃশংস হলে যে মানুষটা তার জীবনের পুরোটা সময় পরিবার-পরিজন ছেড়ে আন্দোলন সংগ্রামে জীবন পার করলেন তার বুকে গুলি চালালো ওরা? আচ্ছা, সেদিন রাতে কি ওই লৌহকঠিন ব্যক্তিত্ববান মানুষটির সামনে বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়াতে হাত কেঁপে উঠেনি ওদের? গুলি চালানোর সময় কি একবার মনে হয়নি ওই বজ্রকঠিন মানুষকে হত্যা করা অসম্ভব? কারণ, তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মৃত্যুঞ্জয়ী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি ইতিহাসের নাম। সংগ্রামমুখর জীবনের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছেন। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছাত্র অবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ ৬ দফার প্রণেতা। ৭০’র নির্বাচনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার ঘোষণায় উদ্দীপ্ত জাতি দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। বাঙালি জাতি তাদের প্রকৃত স্বাধীনতার আনন্দ অনুভব করেন যখন জাতির পিতা পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তার জনগণের কাছে ফিরে আসেন।

৪৬ বছর ধরে বাঙালি জাতি তার পিতা হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছে। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে বাঙালি জাতি আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। পিতা মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পিতা হারানোর শোকের শক্তি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর স্রোতের মতো চির বহমান কাল থেকে কালান্তরে জ্বলছে এ শোকের আগুন।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

(লেখক : সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ।)

Print Friendly, PDF & Email