তালাবদ্ধ সিঁড়ি, স্বপ্ন পুড়ে ছাই - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

তালাবদ্ধ সিঁড়ি, স্বপ্ন পুড়ে ছাই

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা : ১৪ বছরের ফারজানা, ১৬ বছরের মৌমিতার মতো কয়েক শ কিশোর-কিশোরী কাজ করতেন রূপগঞ্জের হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায়। কেউ একান্তই পেটের দায়ে, কেউ আবার পরিবারে একটু সচ্ছলতা ফেরাতে এই বয়সেই নেমে পড়েছিল শ্রম বেচতে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কারখানায় লাগা আগুনে নিজেরা পুড়ে অঙ্গার হয়েছে। এখন তাদের চিনে ঘরে নিয়ে যাওয়া কঠিন স্বজনদের জন্য।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, হাসেম ফুডস কারখানার একটি সিঁড়ি বন্ধ না থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো যেত। চতুর্থ তলায় যারা ছিলেন, সেখান থেকে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি তালাবদ্ধ ছিল। ফলে তারা ছাদে যেতে না পারায় আগুনে অঙ্গার হয়।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধণ মোট ৫২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। এর মধ্যে চতুর্থ তলা থেকে ৪৯ পোড়া দেহ উদ্ধার হয়।

পরে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানান, পোড়া ভবনের ভেতরে আর কোনো মরদেহ নেই। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার কোনো লাশ পাওয়া যায়নি।

এদিকে কারখানার নিখোঁজ কর্মীদের সন্ধানে গতকাল দিনভর রূপগঞ্জের কারখানা ও ঢাকা মেডিকেলে স্বজনদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। তাদের হাহাকারে পরিবেশ ভারী হয়ে ছিল সারাক্ষণ।

বৃহস্পতিবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় সেজান জুস, কোমল পানীয় ও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী তৈরির ওই কারখানায় আগুন লাগে।

গতকাল দুপুরের পর থেকে আগুন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর ছয়তলা ভবনের চতুর্থ তলা পর্যন্ত তল্লাশি চালানো হয়। একে একে বের হতে থাকে পুড়ে অঙ্গার হওয়া মরদেহগুলো। লাশগুলো এতটাই পুড়ে গেছে, সেগুলো দেখে চেনা বা শনাক্ত করার উপায় নেই।

বেশিরভাগ শ্রমিক ছিল কিশোর-কিশোরী
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ ও রূপগঞ্জ এলাকায় পোশাকশিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু নিয়মনীতির বেড়াজালের কারণে শিশু বা কিশোরদের গার্মেন্টসে নিয়োগ দেয়া যেত না। ফলে এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে কিশোর-কিশোরীদের নিয়োগ দেয় হাসেম ফুড। তবে কম বয়সীদের সাধারণত রাতের পালায় রাখা হতো না বলে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মী ফারজানা জানান, তার বয়সী অনেক কিশোর-কিশোরী ছিল কারখানার কর্মীদের মধ্যে।

আরেকজন কর্মী জানান, পোশাক কারখানাগুলোতে কম বয়সীদের নেয় না। তবে হাসেম ফুডসে সেই সুযোগ ছিল বলে স্থানীয় অনেক কিশোর-কিশোরীই সেখানে কাজ করত।

পরিচয় শনাক্তে হবে ডিএনএ পরীক্ষা
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪৯ মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছে পুলিশ। সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট আশরাফুল আলম জানান, যেসব মৃতদেহ আছে, তাদের স্বজনদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। মৃতদেহের সঙ্গে ডিএনএ বিশ্লেষণ করে পরিচয় শনাক্ত করা হবে। ডিএনএ বিশ্লেষণ করে পরিচয় নিশ্চিত করতে ১৫ থেকে ৬০ দিন সময় লাগতে পারে জানা গেছে।

সিঁড়ি বন্ধ না থাকলে বাঁচতে পারত অনেকে
এত বেশি মৃত্যুর কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশিষ বর্ধণ জানান, হাসেম ফুডস কারখানার একটি সিঁড়ি বন্ধ না থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো যেত। তিনি বলেন, ‘আমরা গাড়ির মই সেট করে ছাদ থেকে ২৫ জনকে উদ্ধার করেছি। বাকিরা যদি ছাদে উঠতে পারত, আমরা কিন্তু বাঁচাতে পারতাম। চতুর্থ তলায় যারা ছিলেন, সেখান থেকে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি তালাবদ্ধ ছিল। আর নিচের দিকে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে ছিল ভয়াবহ আগুন। ওনারা নিচের দিকেও আসতে পারেন নাই, তালাবদ্ধ থাকায় ওনারা ছাদেও যেতে পারেন নাই।

অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ছিলই না
হাসেম ফুডস কারখানার ভবনটিতে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম যেমন ছিল না, তেমনি জরুরি বের হওয়ার প্রয়োজনীয় সংখ্যক পথও রাখা হয়নি বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক অপারেশন্স লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘ভবনটির আয়তন প্রায় ৩৫ হাজার বর্গফুট। ওই ভবনের জন্য অন্তত চার থেকে পাঁচটি সিঁড়ি থাকা দরকার ছিল। অথচ বড় এই ভবনে আমরা পেলাম মাত্র দুটি এক্সিট। এর মধ্যে প্রথম এক্সিট ছিল আগুনের মধ্যে। শুরুতেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানে কেউ যেতে পারেনি।

দ্বিতীয় সিঁড়ির কাছেও তাপ ও ধোঁয়ার কারণে ভেতরে আটকে থাকারা যেতে পারেননি বলে তাদের ধারণার কথা জানান তিনি। যে কারণে সেই পথেও শ্রমিকরা বের হতে পারেননি।

ভবনটিতে ফায়ার সেফটি ইকুইপমেন্ট কী কী দেখেছেন এবং তা পর্যাপ্ত ছিল কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তেমন কিছু দেখতে পাইনি। সে রকম কোনো বিষয় চোখে পড়েনি।

দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন ভয়াবহ হয়ে ওঠে
হাসেম ফুড লিমিটেডের ছয়তলা ভবনে প্রচুর প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, কার্টনসহ প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এ কারণে আগুন দ্রুত অন্য ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতেও বেগ পেতে হয়।

হাসেম ফুড কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের ওই ভবনের কারখানায় ২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। ওই ভবন সেন্ট্রাল গোডাউন হিসেবে তারা ব্যবহার করতেন। ওই ভবনে বিভিন্ন জুসের ফ্লেভার, রোল, ফয়েল প্যাকেটসহ বিভিন্ন মালামাল ছিল। আগুন লাগার পর কত শ্রমিক আটকা পড়েছিল, তা তারা জানেন না। তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত।

Print Friendly, PDF & Email