করোনা মোকাবিলায় সচেতনতার বিকল্প নেই - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

করোনা মোকাবিলায় সচেতনতার বিকল্প নেই

ড. সৌমিত্র শেখর: মাঝে মধ্যে একটু সর্দি-কাশি মন্দ লাগত না। পরিবারের সদস্যদের বিশেষ মনোযোগও পাওয়া যেত। ছোটবেলায় সর্দি-কাশি নিয়ে স্মৃতি কার নেই? কিন্তু এখন ভয় লাগে। ঢাকায় বেশ বৃষ্টি হলো কয়েকদিন। এ সময় আমার সন্তানের জ¦র হলে ভুলেই গিয়েছিলাম সেই জার্মান প্রবাদের কথা : ‘সর্দিতে ওষুধ খেলে সারে সাত দিনে আর না-খেলে লাগে এক সপ্তাহ।’ আসলে ভুলে যাইনি। ‘রিস্ক’ নিইনি। প্যারাসিটামল খাওয়ালাম। চার দিনের মাথায় ঠিক। আসলে সর্দি-কাশিতে এখন আমাদের ভয়ের শেষ নেই। এই যে বর্ষা চলছে, জ¦রটর হলেই ভয়ে মনটা কেমন যেন করে! কোভিড-পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন হাসপাতাল বা মেডিক্যাল সেন্টার মানুষের ঘরে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছে আবার চটজলদি পরীক্ষার ফলও জানান দিচ্ছে মোবাইল ফোনে। এই সুযোগ আগে ছিল না। ফলে সুযোগটাও গ্রহণ করছে মানুষ। মুখলেখ বা ফেসবুকে প্রায়ই দেখছি, অনেকে জানাচ্ছেন : নমুনা পরীক্ষায় তার ‘নেগেটিভ’ এসেছে। মহাখুশিতে ইমোজি চাপাচ্ছেন তাই; বন্ধুরা বাহবা দিচ্ছেন। ফলে জ¦র আর সর্দি-কাশি হলেই কোভিড, এমনো নয়। তবু ভয় লাগে; আমরা ভীত হই। সর্দি-কাশি নিয়ে একটি চমৎকার গল্প আছে সৈয়দ মুজতবা আলীর, রোমান্টিক গল্প। ওপরে যে প্রবাদটি উল্লেখ করলাম, সেই গল্পেই পেয়েছি প্রবাদটি। ডাক্তার পিটার আর হবু ডাক্তার এভার মিলনের গল্প। জার্মান যুবক ডাক্তার পিটার হবু ডাক্তার এভাকে কোনোভাবেই বলতে পারছিলেন না যে, তিনি এভাকে ভালোবাসেন আর বিয়ে করতে চান। অনেকবার চেষ্টা করেছেন, অনেক মজার ঘটনাও ঘটেছে। মুজতবা আলীর গল্প মানেই তো হাস্যরস! এখানেও আছে। অবশেষে এভার বাড়িতে পিটার গল্পে শেষবারের মতো যখন গেলেন, সেই যাওয়ার পথেই শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রা আর বরফপতনের কারণে তিনি প্রচ- ঠা-ায় আক্রান্ত হন। এভার ঘরে প্রবেশ করেই ঘর-কাঁপানো শব্দে হাঁচি দিতে থাকেন তিনি। একজন অবিবাহিত নারীর ঘরে একজন অচেনা যুবকের প্রবেশ কোনো দেশেই ভালো চোখে নেয় না, জার্মানিতেও একই অবস্থা। তা ছাড়া এভা মাতাপিতাহারা আর তিনি থাকতেন তার পিতার বোনের তত্ত্বাবধানে। এই পিসি আবার ছিলেন খলস্বভাবের। এভার ঘরে পুরুষের হাঁচির শব্দ শুনে তিনি সেখানে যথারীতি প্রবেশ করলে এভা ভয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়েন। ডাক্তার পিটারও ডর-ভয়-লাজ ত্যাগ করে সেই খলস্বভাবের পিসিকে বলেই ফেলেন, তিনি এভাকে বিয়ে করতে চান। পরিস্থিতি পিটারের অনুকূলে যায়; সবাই সম্মত হয়। এভাবেই ডাক্তার পিটারের কাশি তার প্রার্থিত নায়িকাকে পেতে সাহায্য করে। লেখক গল্পের শেষে তাই লেখেন : ‘বেঁচে থাকো সর্দি-কাশি চিরজীবী হয়ে তুমি।’ কিন্তু আমরা কি সে কথা বলতে পারব? সর্দি-কাশি বা জ¦রের সূত্রে আমাদের জীবনে এভা বা পিটারপ্রাপ্তি তো হয়ইনি বরং অনেক স্বজন বিয়োগ ঘটিয়েছে।

করোনা রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে দেখা দেয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির পর। আমাদের দেশেও সে বছর মার্চ থেকে লকডাউন ঘোষিত হয়, সবকিছুই বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বহু মানুষ করোনায় মৃত্যুবরণ করে। সাধারণ মানুষ তো মারাই যায়, সমাজের কর্ণধার বলে যাদের মনে করা হয়, তাদের মৃত্যুসংখ্যায়ও আমরা আতঙ্কিত হই। শিক্ষা, ব্যবসা, প্রশাসন, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ক্রীড়া- সর্বক্ষেত্রেই বহু প্রতিষ্ঠিতজনকে এ সময় হারিয়েছি। করোনাই প্রধান কারণ, কয়েকজন অবশ্য অন্য রোগেও। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে (মার্চ থেকে ডিসেম্বর) আমরা বুদ্ধিজীবীসহ যত প্রতিষ্ঠিতজনকে হারিয়েছি, ২০২০ সালের নয় মাসে (মার্চ থেকে ডিসেম্বর) তারও চেয়ে কম হারিয়েছি, এমন হয়তো বলা যাবে না। শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান ও জামিলুর রেজা চৌধুরী, আমলা সা’দত হুসাইন, সংগীতবিদ আজাদ রহমান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর, শিল্পী মুর্তজা বশীর, নাট্যজন আলী যাকেরসহ বহু নাম বলা যাবে, যাদের আমরা এই অল্প সময়ের মধ্যে হারিয়েছি। কিন্তু এই মানুষগুলো সৃষ্টি হতে সময় লেগেছে বহু বছর এবং প্রয়োজন পড়েছে আদর্শের সূক্ষ্মবয়নের। ২০২১ সাল আরম্ভ হলে এই ধারা থামেনি। রাবেয়া খাতুন, এটিএম শামসুজ্জামান, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, মিতা হক, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, শামসুজ্জামান খানসহ অনেক জ্ঞানীগুণীকে আমরা ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছি। অনেকে যে অসুস্থ আছেন, সে খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হোক। নিশ্চয়ই এই মিছিল শুধু বাংলাদেশে, এমন নয়; সারাবিশে^ই। তবে আমাদের দেশে রোগ প্রতিরোধের ব্যাপারটি তো আমাদেরই দেখতে হবে।

করোনা প্রতিরোধে টিকাদান ও গ্রহণ প্রক্রিয়া দেশে যথারীতি চালু আছে এবং এ ব্যাপারে সরকার সজাগ। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমরা সচেতন কি? নাকেমুখে বিশেষ ঢাকনা বা মাস্ক ব্যবহার করা করোনা রোগ প্রতিরোধে যেখানে বিশ^ব্যাপী প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে, আমাদের দেশে সেখানে এ ব্যাপারে উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। ‘সময়’ টেলিভিশনের একটি ক্লিপিং বেশ ভাইরাল বা বহুল প্রচার পেয়েছে। সাংবাদিক কোনো একজন সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করেছেন : ‘মাস্ক পরেন না কেন?’ উত্তরে লোকটি বলেন : ‘মাস্ক না পরার কারণে আমার বাপের বংশের কেউ মরে নাই, নানার বংশের কেউ মরে নাই, পাড়া-প্রতিবেশী কেউ মরে নাই। আমি মাস্ক পইরা নিজে মরমু নাকি?’ এটি শুধু সেই সাধারণ মানুষটির কথা নয়, শিক্ষিত বলে দাবিদার অনেকেই মাস্ক না পরে এভাবেই চলে। আমি নিজে দেখেছি, একজন সাবরেজিস্ট্রার এজলাসে বসে শত শত মানুষের সামনে জমি রেজিস্ট্রেশন করাচ্ছেন। তার দিকে সেই মানুষগুলো মুখ করে আছে। তাদের অনেকের মুখ খোলা। সাবরেজিস্ট্রার সাহেবেরও মাস্ক নেই। এ ব্যাপারটি নাকি নতুন নয়। এভাবেই তিনি থাকেন। বলেন, কিচ্ছু হবে না। এই সেদিন খবর পেলাম : সাবরেজিস্ট্রার সাহেবও করোনাক্রান্ত!

‘কঠিন রোগটি আমার হবে না’- এই বিশ^াস আমাদের বেশিরভাগ মানুষের। তাই যথাসময়ে শরীর-পরীক্ষা করানোর ধারণা এ সমাজে গড়ে ওঠেনি। অতিপ্রাকৃতে বেশি বিশ^াস বলে, অধিকাংশ মানুষই রোগ হলে তুকতাকের শরণাপন্ন হয়। তাদের ধারণা, সেরে যাবে। আমাদের সমাজে শরীরচর্চার ধারণাও লোপ পেয়েছে। আগে যোগব্যায়াম বা শরীরচর্চা বাঙালির, বিশেষ করে হিন্দু বাঙালি ঘরের পুরুষদের মধ্যে প্রায় নিয়মিত ছিল। পুরনো সিনেমাগুলোতে দেখা যায়, নদীর তীরে মুগুর হাতে ব্যায়ামের দৃশ্য। মাঝে এটা সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল। পরিবারে কেউ ব্যায়াম করলে বরং তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করা হতো। ইদানীং ধর্ম-নির্বিশেষে সব বাঙালিই আবার ব্যায়ামের দিকে ঝুঁকেছে। আধুনিক ব্যায়ামাগারও স্থাপিত হয়েছে নানা স্থানে। এটা ভালো দিক। নারীদেরও গৃহাভ্যন্তরে হলেও ব্যায়ামের প্রতি আকৃষ্ট করা দরকার এবং বাড়িতে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে স্বাস্থ্যরক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে লজ্জা নেই। এক সময় বাড়িতে তুলসীগাছ রাখাকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখা হতো। এ নিয়ে ব্যঙ্গ-টিপ্পনিও ছিল প্রচলিত। কিন্তু এখন সবাই জেনে গেছে, তুলসীগাছ থেকে কী উপকার পাওয়া যায়। আমি করোনার আগে যশোরে বিশেষ কাজে গিয়েছিলাম। দেখি, দীর্ঘ মূল সড়কের মধ্যবর্তী বিভাজনক্ষেত্রে হাজার হাজার তুলসীগাছ লাগানো। এখান থেকে পাতা সংগ্রহ করে শহরের মানুষরা উপকৃত হচ্ছে। এক সময় একই থালা থেকে বহুজনের খাদ্যগ্রহণকে বলা হতো ঐক্যের প্রতীক। বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই বিষয়টি। এটি করলে নাকি সৌভ্রাতৃত্ব বাড়ে! বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সৌভ্রাতৃত্ব বাড়ে কিনা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যেটি নিশ্চিত করে বলা যায়, সেটি হলো : এতে রোগের বিস্তার ঘটে। এটি জানার পর একবার ব্যবহারের থালা, গ্লাস, কাপ এখন পৃথিবীর অন্যত্রর মতো এ দেশেও জনপ্রিয়। ইনজেকশন গ্রহণ থেকে এক কাপ চা-পানের সময় মানুষ ‘ওয়ান টাইম’ ব্যবহার্য উপাদান খোঁজে। দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যরক্ষার সবই বাঙালিরা একটু পরে গ্রহণ করেছে। এবারও কি তাই হবে? কেননা এখনো লোকারণ্যে মাস্কহীন মানুষের যে ভিড়, পরিবহন বা বাজারে মাস্ক নিয়ে মানুষের যে উদাসীনতা তা আতঙ্কের নিশ্চয়ই। করোনা বিস্তারের যে পরিসংখ্যান ও চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বলা হচ্ছে, এই ভাইরাস ‘অবলম্বন’ করেও ছড়ায়। মাস্কহীন মানুষগুলো কি সেই ‘অবলম্বন’ হয়ে উঠছে না? ঢাকাকে পাশর্^বর্তী জেলাগুলো থেকে আপাতত বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কিন্তু এভাবে কি সমাধান আসবে, যদি আমরা সচেতন না হই, আমরা মাস্ক ব্যবহার করে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন না হই? এটি যদি করা না যায়, তা হলে মৃত্যুর মিছিল তো থামবে না। আমাদের জীবনে সর্দি-কাশি থাকুক, অতীতে যেমন ছিল। কিন্তু তা যেন মৃত্যুর উপসর্গ না হয় : মৃত্যুর মিছিলে বেঁচো না সর্দি-কাশি!

ড. সৌমিত্র শেখর : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email