ছেলের কবর ভেঙ্গে নিল সর্বনাশা পদ্মা - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

ছেলের কবর ভেঙ্গে নিল সর্বনাশা পদ্মা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, মানিকগঞ্জ : আমার ছেলেডা মারা গেছে ২৫ বছর হলো। ছেলের কবরের পাশেই আমরা দুইজন থাকার আশা করছিলাম, কিন্তু তাও নদীতে নিয়া গেছে। এখন আমাগো হেই আশা রইলো না, তাই আমাগো আর এহেনে থাহারও ইচ্ছা নাই। নদী ভাঙনের কারণে থাকবারো পারছি না। এহন তো ভয় পাইতাছি কোন জায়গাতে যামু আমাগো যাওনের জায়গাও তো নাই।

অনেক কষ্টে কথাগুলো বলছিলেন হরিরামপুর উপজেলার উত্তাল পদ্মা পাড়ের কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের কোর্টকান্দি পশ্চিমপাড়া এলাকার রহিমা বেগম (৭৫)।

তিনি বলেন, এক সময় আমাগো গোলা ভরা ধান, পাল বোঝাই গরু ছিলো, কিন্তু এই পদ্মা নদী আমার সোনার সংসার ভেঙে চুরমার করে দিছে। একশ শতাংশ জায়গার উপর বসতবাড়ি ছিলো এক সময়। নদীতে ভাঙতে ভাঙতে এখন আছে মাত্র চার পাঁচ শতাংশ জায়গা, এখন ভাঙনের কবলে পড়ে হারাতে বসেছি শেষ সম্বলটুকুও।

সরেজমিনে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ বছর আগ ভাগেই নদীতে পানি বাড়ায় হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে নদী ভাঙন আর এতে অনেকেই বাড়ি ঘড় ছেড়ে চলে যাচ্ছে আবার অনেকে পৈত্রিক ভিটার শেষ পরিণতি নিজ চোখে দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। গত কয়েকদিন আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কারণে পদ্মা নদীতে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় আর ওই সময় থেকে ভাঙন শুরু হয়ে বেশ কয়েকটি ঘড়-বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

জেলার হরিরামপুর উপজেলার নদী তীরবর্তী মানুষ কোনো প্রকার ত্রাণ চায় না তাদের একটিই দাবি পদ্মার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা আর এ জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে একটিই প্রত্যাশা তাদের। পদ্মা নদীর পানি বাড়ি-ঘরের উঠানে এসে উঁকি দিচ্ছে আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, সব মিলিয়ে নদীর পানির স্রোতের সঙ্গে উঠানের মাটির চাপ ভেঙে পড়ে বিলীন হচ্ছে নদী গর্ভে।

রহিমা বেগমের স্বামী আবুল ফজল (৮৭) বলেন, জন্মের পর থেকে দেখে আসছি নদী ভাঙন তবে গত কয়েক বছর ধরে এই অংশে ভাঙন বেশি হচ্ছে। নদী ভাঙনে আমার মতো হাজারো পরিবার সর্বশান্ত হয়ে পথের ফকির হয়ে গেছে। অথচ এক সময় আমাগো পরিবার অবস্থাশীল ছিলো, বাড়িতে গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর কাজের জন্য বাড়িতে তিন চার জন করে রাখাল থাকতো। পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছি, আমার ছেলেরা আজ অন্যের বাড়িতে কাজ করে দুই বেলা পেটের ভাত যোগার করে “ বিধির বিধান বোঝা বড় দায়”। আমার ছোট ছেলের কবর ছিলো বাড়ির উঠানে, গত বছরও ছিলো কিন্তু এ বছর নদী ভাঙনে সেই কবরও বিলীন হয়ে গেছে।

হরিরামপুর উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউনুস উদ্দিন গাজী বলেন, এ বছরও নদী ভাঙনের কবলে পড়ে বেশ কয়েকটি বাড়ি পদ্মার গর্ভে চলে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পদ্মার করাল গ্রাস থেকে এই কাঞ্চনপুর ইউনিয়নকে রক্ষা করা না গেলে এক সময় পুরো উপজেলা সর্বনাশা পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। জেলা থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন আসছিলো খুব শিগগিরই জিও ব্যাগ ফেলবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাইনুদ্দিন বলেন, পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কোভিডের কারণে প্রকল্পটি অগ্রসর হতে একটু দেরি হচ্ছে তবে হরিরামপুর উপজেলার বাহাদুরপুর থেকে কাঞ্চনপুর এলাকায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email