ক্রমেই হচ্ছে ধূসর পাহাড়ের সবুজ রূপ - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

ক্রমেই হচ্ছে ধূসর পাহাড়ের সবুজ রূপ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, খাগড়াছড়ি : একটি দেশের আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ সরকারি হিসেবে আমাদের দেশে আছে ১৭.৪। যার চার ভাগ ভুমিকা রেখেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ রুপ ক্রমেই ধূসর হচ্ছে। পাহাড় কাটা, বৃক্ষ নিধনের ফলে আজ অধিকাংশ পাহাড় ক্ষতবিক্ষত রুপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে হচ্ছে। যা অদুর ভবিষ্যতের জন্য সুখকর নয়। ব্যাপক বন ধ্বংসের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে অনেক প্রজাতির পাখি ও জীবজন্তু আজ বিলুপ্ত।

প্রতি বছর ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য ব্যাপক হারে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করা হয়। ঘরের আসবাবপত্র তৈরির জন্য হু হু করে বাড়ছে কাঠের চাহিদা। জুম চাষের জন্য পুড়ছে পাহাড়। বন ধ্বংসের জন্য এসব বড় কারণ।

যার কারণে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। আবার অতিরিক্ত ভুমি ক্ষয় ও পাহাড় ধ্বংসের কারণে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। অপরদিকে, পাহাড়ে ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ নির্বিচারে গাছ ও পাহাড় কাটা।

ইতোমধ্যে, পাহাড়ের অসংখ্য ঝিরি, ঝর্ণা শুকিয়ে গেছে। তীব্র পানি সংকটের কারণে অনেক এলাকায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ভোগান্তিতে পড়েছেন। বর্ষায় পাহাড় ধস যেন স্বাভাবিক ঘটনা। শতবছর পুরনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলো আজ যে বৃক্ষ শূন্য।

উন্নয়নকর্মী ও গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, যে হারে বন ধ্বংস হচ্ছে, সে হারে বনায়ন হচ্ছে না। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা পড়ছে। জুম চাষ পদ্বতিতে ভিন্নতা আসায় এটিও ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি কারণ। যে পাহাড়ে কয়েক বছর পর পর জুম চাষ হতো এখন পাহাড় কমে যাওয়ার কারণ একই পাহাড়ে সার দিয়ে প্রতি বছর জুম চাষ করতে হচ্ছে।

বর্তমানে পাহাড়ে একমুখী চাষাবাদ বা বাগান করা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন দরকার। না হয় অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য বড় রকম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

পরিবেশ সুরক্ষায় আইন থাকলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি, বন বিভাগের ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের সহায়তায় প্রতিদিন পরিবেশ রক্ষা করা যাচ্ছেনা।

ষাটের দশকে দেওয়া কাপ্তাই বাঁধকে অনেকে পরিবেশের বিরুপ আচরণের সূচনা বলে দাবি করেন। এই বাঁধের ফলে পাহাড়ের ৫৪ হাজার একর বসতিযোগ্য ও বনজ সম্পদ তলিয়ে গেছে। এর ফলে ৬৪ হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। বসতিপূর্ণ জায়গা কমে যাওয়ায় তারা বিভিন্ন পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। পরবর্তীতে আশির দশকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসায় প্রভাব পড়েছে প্রকৃতিতে।

কারণ দিনে দিনে জনসংখ্যা বাড়লেও পাহাড় কিংবা বসতিযোগ্য জায়গা বাড়েনি। ফলে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কোপ পড়েছে প্রাণ প্রকৃতিতে।

খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি সাংবাদিক প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধ দেওয়ার ফলে পাহাড়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিবেশের ক্ষতির সূচনা হয়। এখন পাহাড়ে নামমাত্র সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি বড় কারণ। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অভয়াশ্রম পাবলাখালিরও অবস্থা এখন করুণ। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকার পাহাড়ে সমীক্ষা চালিয়ে পাহাড় উপযোগী গাছ লাগানোর ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বনের উপর নির্ভরশীল মানুষকে যুক্ত করে উৎসাহিত করতে হবে।

এখন থেকেই যদি প্রকৃতি রক্ষায় নীতিমালা তৈরিসহ নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া যায় তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে জানান তিনি।

Print Friendly, PDF & Email