রোজিনা ইসলাম নয়, এ আর্তনাদ সবার - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

রোজিনা ইসলাম নয়, এ আর্তনাদ সবার

এইচ বি রিতা: দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার রিপোর্টার রোজিনা ইসলামকে পাঁচ/ছয় ঘন্টা আটকে রেখে হেনস্তা করা এবং শত বছরের পুরনো অফিসিয়াল সিক্রেটস এ্যাক্ট-এর অধীনে মামলা করে তাকে কারাগারে পাঠানো, শুধু সাংবাদিকদেরই নয় বরং পুরো দেশবাসীকে হতবাক করেছে। ২০মে রোজিনা ইসলামের জামিন আবেদনের শুনানি হলেও জামিন হয়নি, রোববার আদেশের দিন নির্ধারণ করেছে আদালত।

১৭ মে সকালে রোজিনা ইসলাম বেরিয়েছিলেন করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার জন্য। এরপর তিনি মন্ত্রনালয়ে প্রবেশ করেছিলেন। এখন তিনি কারাগারে।

পেশাগত জীবন ছাড়াও সাহসী স্বনামধন্য সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম একটি ছোট শিশুর মা। তথ্য চুরির অপরাধে সচিবালয়ে পাঁচ ঘন্টা হেনন্থার এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। কিন্তু তাকে চিতিৎসা না দিয়ে গ্রেফতার করা হলো। যেখানে অপরাধের কথাই স্পষ্ট ছিলনা, সেখানে তাকে তিন দিন কারাগারে আটক রাখলেন! তাঁর অপরাধ কি ছিল?

স্বনামধন্য নারী সাংবাদিক রোজিনা ইসলানের বিরুদ্ধে অ্ভিযোগ আনা হয়েছে যে, তিনি মন্ত্রনালয়ের কক্ষে প্রবেশ করে সরকারী নথিপত্রের ছবি তুলেছেন বা চুরি করার চেষ্টা চালিয়েছেন।

 

আরো পড়ুন: >> পরিবর্তন না হওয়াই বরং অস্বাভাবিক  <<

 

জনস্বার্থে সরকারী দুর্নীতি বা অনিয়ম ফাঁস করতে গিয়ে সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। যেহেতু সরকার খুশ মেজাজে সেইসব গোপন তথ্য কোন সাংবাদিকের হাতে তুলে দিবেন না, তাই গোপনে-কৌশলে সেই সব দলিল-পত্র সাংবাধিকদের সংগ্রহ করতে হয়। কখনো পিয়নের হাতে দুই চার টাকা দিয়েও কাজ আদায় করতে হয়। তাদের উদ্দেশ্য অর্থ-সম্পদ চুরি করা নয়, তথ্য সংগ্রহ করা। কারণ প্রমান ছাড়া দুর্নীতি প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই সব তথ্য সংগ্রহের কাজকে যদি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তবে সাংবাদিকতার অস্তিত্ব কোথায়? শুধু সরকারের গোলাম হযে থাকা?

একজন সাংবাদিকের কাজই হচ্ছে উপযুক্ত প্রমানাদিসহ সত্য ঘটনা উপস্থাপন করা, সংবাদ সম্পাদনা করা, প্রয়োজনে মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া, বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা সহ তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করা; প্রয়োজনীয় ছবি সংগ্রহ করা। প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী একজন সাংবাদিকের কাজের ধরন আলাদা হতে পারে। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী রিপোর্টিং এর কারণেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জনসমক্ষে বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি এবং অনিয়মের কথা প্রকাশ করা জনস্বার্থে প্রয়োজন। রোজিনা ইসলাম তাই করেছিলেন। তিনি অর্থ সম্পদ লুট করতে হাতে অস্ত্র নিয়ে সচিবালয়ে ঢুকেননি। তিনি তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে শক্তিশালী অস্ত্র বলতে কলমটি হাতে নিয়ে সেখানে ঢুকেছিলান।

রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য খাত-এর বহু অনিয়মের তথ্য আমাদের কাছে তুলে ধরেছিলেন, যা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতাম না।জাতির স্বার্থে এ কাজ তিনি করেছিলেন। স্বাধীনতা পদকের ভয়ানক কেলেঙ্কারি ফাঁস করেছেন, ৫ জন সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাসনদ নিয়ে সরকারি সুবিধা ভোগ করার নথি ফাঁস করেছিলেন। এসব এখন সবার জানা। এ সকল সাংবাদিকতা আমরা প্রতিটা সাংবাদিকের কাছেই আশা করি।

সাংবাদিকদের কাছে আমাদের সাধারণ মানুষদের আশা প্রত্যাশা অনেক বেশী। যেহেতু সাধারণ মানুষের জীবনে গণমাধ্যম সরাসরি প্রভাব ফেলেছে, তাই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা একজন সাংবাদিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর সেই দায়ীত্ব পালন করতে গিয়েই আজ রোজিনা ইসলামের মত একজন দক্ষ সাহসী সাংবাদিক জেল খাটছেন।

যে ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ আইনটি ব্যবহার করে রোজিনা ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এই আইনে এর আগে কাউকে গ্রেপ্তার বা অভিযুক্ত করার নজির পাওয়া যায়নি। এটি গৃহীত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, ১৯২৩ সালে।

“ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৭ (১) অনুযায়ী কোনো অজামিনযোগ্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত যে-কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আটক করা হলে, বা সে নিজে হাজির হলে বা তাকে আদালতে হাজির করা হলে, তাকে জামিনে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধে দোষী হয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ উপস্থিত থাকে, তাহলে উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দেয়া যাবে না। তবে শর্ত থাকে যে, আদালত কোনো ১৬ বছরের কম বয়সি যে-কোনো ব্যক্তি বা এই জাতীয় অপরাধে অভিযুক্ত যে কোনো মহিলা বা অসুস্থ ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। অজামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি অধিকার বলে জামিন চাইতে পারেন না।”

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৭ (১) অনুযায়ী, রোজিনা ইসলাম একজন মহিলা, তারপর তিনি একজন অসুস্থ্য ব্যক্তি। তিনি জামিন পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তাকে জামিম দেয়া হয়নি।

 

আরো পড়ুন: >>  শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তোমায় কার্ল মার্ক্স <<

 

যাদের বিরুদ্ধে সাহসী রিপোর্ট করায় আজ রোজিনা ইসলামকে ফাঁসানো হয়েছে, তাদের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই অনেক দুর্নীতি জনগনের সামনে চলে এসেছে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তা না হলে তাদেরও প্রশ্নের সন্মূখীন হতে হবে। জনগন আজ যথেষ্ট সচেতন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকরী ভূমিকা রাখতে
সাংবাদিকেরা আজ যেভাবে এক হয়েছেন, এটা আরো আগে হতে পারতো। অতীতেও আমরা এমন বহু সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যা দেখেছি। কিন্তু তখন সাংবাদিকদের মধ্যে এতটা ঐক্য কি দেখেছি আমরা?

২০১৯ সালের ২২ মে জামালপুর সদরের রানাগাছা এলাকায় রেললাইনের পাশে ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন নামের তরুণ সাংবাদিকের লাশ পাওয়া যায়। এই হত্যার সাড়ে ১৭ মাস পরে গত বছর মাত্র একজন আসামি ধরা পড়ে। কিন্তু এর নেপথ্যে কে বা কারা রয়েছেন, তা এখনো এক রহস্য। মূলত তাঁর অপরাধ ছিল ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি তদন্তমূলক রিপোর্ট করা।
জেলখানায় মুশতাকের মৃত্যু, মুনিয়া আত্মহত্যা মামলা নিয়েও গনমাধ্যমে সাংবাদিকদের নীরবতা ও দায়ীত্বহীনতা নিয়ে জনমতে নানান প্রশ্ন ছুড়া হচ্ছে। আমরা সেগুলোও এড়িয়ে যেতে পারি না।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা বহু বছর ধরেই বিপর্যয়ের মুখে। তাদের কলমের স্বাধীনতা, অধিকারে সীমানা টেনে দেয়া হচ্ছে। আজকের রোজিনা ইসলামের ঘটনাটি নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। আমরা জানি কিভাবে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ফাঁসানো হয়েছে। সরকার অবশ্যয়ই রোজিনা ইসলামের পক্ষে যাবেন না, বরং তাকে দোষী সাব্যস্ত করাই হবে আসল কাজ। এবং সেটা করা হলে, শুধু রোজিনা ইসলামই নন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এ এক বিরাট বিপর্যয় নিয়ে আসবে।

রোজিনা ইসলামের প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ডে বিশ্ববাসী অবাক। দেশ-বিদেশের সকল সাংবাদিকরা আজ একত্রিত হয়েছেন। আমরা চাই রোজিনা ইসলাম সঠিক ন্যায্য বিচারে আবারো পূর্বাবস্থায় ফিরে আসুক। সাংবাদিকরা স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়া জাতির স্বার্থে তাদের কাজ অব্যাহত রাখুক।

 

লেখক

এইচ বি রিতা, নিউইয়র্ক

সাংবাদিককলামিষ্টকবিশিক্ষক

Print Friendly, PDF & Email