কোরআনের অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

কোরআনের অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন

দুলাল শর্মা চৌধুরী : এক সময় নরসিংদীকে বঙ্গোপসাগরের বক্ষ থেকে জেগে ওঠা একটি দ্বীপ বলে ভাবা হত। কিন্তু প্রশ্নতাত্ত্বিক ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর ওয়ারি বটেশ্বর এবং বেলাব আশরাফুরের তাম্র শাসনের লিপি পাঠে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, এটি ছিল প্রাচীন নগরী। মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ ও শীতলক্ষ্যার কোলে শ্যামল কোমল সবুজে শিল্প সাহিত্যের গৌরবে গৌরবান্বিত কৃতি সন্তানদের গৌরবোজ্জ্বল এক রত্নভূমি নরসিংদী। এসব কীর্তিগাঁথা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের ৪১টি নগরের মধ্যে ২য় এবং উভয় বাংলার প্রাচীন ১২টি নগরের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের নরসিংদী বটেশ্বর-ওয়ারী।
এই নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে ১৮৩৪ সালে বিখ্যাত দেওয়ান বৈদ্য বংশের অভিজাত, সুশিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিবার আলোকিত ও আলোচিত মানুষ গিরিশচন্দ্র সেন জন্মগ্রহণ করেন। মাধবরাম রায় এবং জয়কালী দেবীর তিন ছেলে-তিন মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ট সন্তান। তার পিতামহ রামমোহন রায় এবং প্রপিতামহ ইন্দ্রনারায়ণ রায়। প্রপিতামহের তিন ভাইয়ের একজন দর্পনারায়ণ রায়। তিনি নবাব আলীবর্দী খাঁর সময় মুর্শিদাবাদে নবাবের দেওয়ান ছিলেন এবং জনহিতকর কাজে ব্রতী ছিলেন। দর্পনারায়ণ রায়ের প্রভাবেই বংশের গৌরব ও সম্মান এখনও তুঙ্গে। তাদের বংশ ছিল সেন, আলীবর্দী খাঁ থেকে প্রাপ্ত উপাধি ছিল রায় আর দেওয়ানী করতেন বলে প্রচলিত উপাধি দেওয়ান। তবে জাতিগতভাবে তারা বৈদ্য সম্প্রদায় এবং শাক্তধারার উপাসক। আভিজাত্যে ও বংশ মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ থাকলেও পরিবারটি ছিল গোঁড়াপন্থী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। গিরিশচন্দ্র সেন জীবনের প্রথম দিকে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ের। আট বছর বয়সে তার পিতার মৃত্যু হয়। ছোট বলে সকলের আদর-স্নেহ পেতেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন। নিরামিষ খাবার পছন্দ করতেন এবং কম দামের পোশাক পড়তেন। পাঁচ বছর বয়সে কুল গুরু বিশ্বনাথ মহাশয়ের নিকট বিদ্যা শিক্ষার হাতে খড়ি। ১২ বছর বয়সে কুল গুরুর কাছে শিবমন্ত্র গ্রহণ করেন। ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে, তিনিই পরে ভিন্ন ধর্মীয় দর্শনের ওপর গবেষণা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
বারো বছর বয়সেই তিনি ঢাকা পোগোজ স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে শিক্ষকগণ পড়ার জন্য ছাত্রদের ভীষণ মারধর করতেন। তিনি এসব দেখে স্কুলের পড়া ছেড়ে দিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যান। সেখানে মুনশী রুদ্ধেশ্বর গুপ্ত ও একজন মুসলমান মুনশীর নিকট এবং সংলগ্ন শানখোলা নিবাসী মুনশী কৃষ্ণচন্দ্র সেনের নিকট ফারসি ভাষা রপ্ত করেন। তখন তার বয়স ১৮ বা ১৯। ফারসি ভাষায় তিনি অভিজ্ঞ হয়ে উঠেন। গিরিশচন্দ্র সেনের পিতা ও পিতূব্য মুনশী রাধারাম রায় ও গঙ্গাপ্রসাদ রায়, পিতামহ মুনশী রামমোহন রায় এবং প্রপিতামহ ইন্দ্রনারায়ণ রায় সকলই ফারসি ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। তাদের স্বহস্তে লিখিত ফারসি বই গৃহে থাকায় ফারসি চর্চা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। ব্রিটিশ শাসিত হলেও ইংরেজি তখনও রাজভাষা হয়নি। ফারসি ছিল রাজভাষা। মুদ্রাযন্ত্র ছিল না তাই হস্তলিপিই একমাত্র ভরসা। দেওয়ানী কাজে প্রপিতামহ দর্পনারায়ণ মুর্শিদাবাদে থাকতেন। এমন কি পরিবারের অনেকেই সেখানে চাকুরিতে নিযুক্ত হন। বংশপরম্পরায় তাদের হস্তাক্ষর ছিল মুক্তার মত ঝকঝকে।
কাজের সন্ধানে গিরিশচন্দ্র সেন মেঝদা হরচন্দ্র সেনের সঙ্গে ১৮৫২ সালে ময়মনসিংহ শহরে আসেন। মেঝদা সংস্কৃত ভাষা এবং আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন। ময়মনসিংহে তিনি মৌলভী আবদুল করিমের কাছে রোকাতে আলামী অধ্যয়ন করেন। ফারসি ভাষায় দক্ষ হওয়ার কারণে মৌলভী সাহেবের কাচারিতে নকলনবিশের কাজ পেয়ে যান। তবে যথাযথ বেতন পেতেন না বলে ছ মাস পর একাজ ছেড়ে দেন। ১৮৫৩ সালে ময়মনসিংহে ভাগবানচন্দ্র বসু স্থাপিত সংস্কৃত স্কুলে ভর্তি ও পড়ালেখা চালিয়ে যান। অতঃপর ময়মনসিংহ নর্মাল স্কুলে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম স্থান অর্জন করেন। হান্ডিঞ্জ স্কুলের দ্বিতীয় পন্ডিত হিসেবে যোগদান করেন। অল্প কিছু পরে জেলা স্কুলের পন্ডিতের পদে নিয়োগ পান। তিনি ১৮৫৮ সালে ২১ বছর বয়সে ১২ বয়সের ভাটপাড়া গ্রামের ব্রহ্মময়ী দেবীকে বিবাহ করেন। এ বছরই তিনি ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন। ১৮৬৮ সালে তার প্রথম বই বনিতা-বিনোদ প্রকাশিত হয়। স্বামী-স্ত্রীর কতোপকথন ও প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে স্ত্রী শিক্ষার আবশ্যকতা নিয়ে লেখা বইটি তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয়ে পাঠ্য বইয়ের মর্যাদা পেয়েছিল। ১৮৬৯ সালে স্ত্রী একমাত্র কন্যা সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু ১৫ দিন পর কন্যার মৃত্যু হয়। একই বছর স্ত্রীও বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সব হারিয়ে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। সংসার জীবনে আর ফিরে যাননি। ১৮৭০ সালে ঢাকা প্রকাশ পত্রিকার ময়মনসিংহের সংবাদদাতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৭২ সালে কলকাতা যান, সেখানে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক কেশবচন্দ্র সেনের সাথে পরিচয় হয় এবং তার ভারত আশ্রমে যোগদান করেন।
ব্রাহ্মধর্ম হল উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার একটি ধর্মীয় আন্দোলন। এই আন্দোলন থেকেই সেকালের বাংলার নবজাগরণ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাক পর্যায়। বৃহত্তর ক্ষেত্রে হিন্দুধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত। রাজা রামমোহন রায় একেশ্বরবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন ১৮২৯ সালে। ১৮৬৯ সালে কেশবচন্দ্র সেনের দীর্ঘদিনের বন্ধু আনন্দমোহন বসু কলকাতায় সস্ত্রীক ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। ধারাবাহিক সংস্কারে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্রের হাত ধরে এটি নব বিধান ব্রাহ্মসমাজে রূপান্তর করেন। ময়মনসিংহ শহরে ব্রাহ্মধর্মের চর্চা শুরু হয় ১৮৫৪ সালে। সে সময় ব্রাহ্মীদের মহৎকর্ম ময়মনসিংহে হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের জাগরণ ঘটায়। শশীকান্ত মহারাজ গাঙ্গিনার পাড়ে ৫২ শতাংশ জায়গা দান করেন ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য। ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহে আসেন। পরদিন মঙ্গলবার স্কুলে আটটায় ব্রাহ্মসমাজের লোকজন গাঙ্গিনাপাড় ব্রাহ্মমন্দিরে কবিকে সংবর্ধনা দেন। ১৯৬৭ সালে উক্ত স্থানের প্রায় অর্ধেক জায়গায় গড়ে উঠে ময়মনসিংহ ল’ কলেজ।
গিরিশচন্দ্র সেন ১৮৭৫ সারল কলকাতা যান এবং ব্রাহ্মধর্ম নববিধান পরিষদ মন্ডলির প্রচারক হয়ে উভয় বঙ্গ এবং আসাম রাজ্যের অনেক গ্রাম-শহর ঘুরেন। ব্রাহ্মণ আধিপত্যে হিন্দু সমাজের বিরোধিতার মুখে একসময় ব্রাহ্মসমাজ ম্লান হয়ে যায়। গিরিশচন্দ্র সেন কলকাতায় কেশবচন্দ্র সেন স্থাপিত বালিকা বিদ্যালয়ে কিছুদিন শিক্ষকতা শেষে ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু ও সুলভ নামীয় দুটি পত্রিকার সম্পাদনা করেন।
ব্রাহ্মধর্মের মূল তত্ত্বই হল সকল ধর্মের সমন্বয়। কিন্তু সমন্বয় করতে হলে মূল চারটি ধর্ম যেমন-ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্ট ধর্মের মূল গ্রন্থগুলো বাংলায় অনুবাদের প্রয়োজন। নববিধান পরিষদ মন্ডলীর প্রতিষ্ঠাতা কেশবচন্দ্র সেন এসব কাজে চারজন ব্রাহ্মপন্ডিতকে দায়িত্ব দেন। আর স্বভাবতই বাংলা সংস্কৃত আরবী ফার্সী ভাষার সুপন্ডিত ছিলেন বিধায় গিরিশচন্দ্র সেন মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন অনুবাদের দায়িত্ব পান। এক সময় বঙ্গদেশে আশরাফদের মাতৃভাষা ছিল উর্দু আর আতরাফদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। রামায়ণ, মহাভারত, গীতা কিংবা বাইবেল বাংলায় অনেক আগেই অনুবাদ প্রকাশিত হলেও কোরআন হাদিসের মূল ভাষা আরবী থেকে বাংলায় রূপান্তর করলে পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হবে এই আশংকায় তখন কোনও মুসলিম মনীষী এর বঙ্গানুবাদ করতে এগিয়ে আসেননি। ইসলাম ধর্মের ওই দুঃসময়ে নওয়াব আব্দুল লতিফের উৎসাহে ও মাওলানা কেরামত আলীর অনুমতি নিয়ে মুনশী মেহেরউল্ল্যা ছোট ছোট বইয়ে কেবল ইসলাম ধর্মের সার লিখে প্রচার করতে থাকেন। এতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। কিন্তু ইসলাম ধর্মের কোনও বইয়ের অনুবাদ তখনও বের হয়নি।
দায়িত্ব পেয়ে গিরিশচন্দ্র সেন অনুধাবন করেন কোরআন অনুবাদ করতে হলে মূলধর্ম শাস্ত্র কোরআন পাঠ এবং এর গূঢ়তত্ত্ব অবগত হতে আরবী ভাষা ভালোভাবে চর্চা এবং রপ্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু ৪২ বছর বয়সে তা কঠিন হলেও কেশবচন্দ্রের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি এ কাজে ব্রতী হন। তিনি ব্রাহ্মসমাজের সহযোগিতা নিয়ে ১৮৭৬ সালে লক্ষেèৗ যান। সেখানে এক বৃদ্ধ মৌলানা এহসান আলী সাহেবের নিকট আরব্য ব্যাকরণ ও ফারসি ভাষা আলিমুদ্দিনের কাছে আরবি ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে আরবি ভাষা শিখে ঢাকায় চলে আসেন। ১৮৭৮ সালে তিনি বন্ধু জামাল উদ্দিনের মাধ্যমে কোরআন সংগ্রহ করেন। ময়মনসিংহ ফিরে একসিরাদির সাহায্যে আয়াত সমূহের অর্থ বুঝতে পেরে অনুবাদে প্রবৃত্ত হন। তিনি উর্দু ভাষায়ও সুপন্ডিত ছিলেন। শাহ আব্দুল কাদের ও শাহ রফিক উদ্দিনের উর্দু অনুদিত কোরআন থেকে সাহায্য নেন। অনুবাদকালে তিনি যশোরের মৌলভী আলতাফ উদ্দিনের কাছ থেকেও পরামর্শ পান। ১৮৮১ সালের শেষভাগে কোরআন শরিফের অনুবাদ করে শেরপুরের চারুযন্ত্র প্রেস থেকে প্রথম খন্ড প্রকাশ করেন। একজন হিন্দু ধর্মীয় লোকের হাতে কোরআন অনুবাদ হওয়ায় সমালোচনাও হয়। ১৮৮২ সালে কলকাতা থেকে বিধান যন্ত্রে দ্বিতীয় খন্ড মুদ্রিত হলে আলেম সমাজের কয়েকজন গিরিশচন্দ্রের কাজকে অভিনন্দিত করেন। মুসলমান জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করতে থাকেন। প্রায় দুই বৎসরে কোরআন সম্পূর্ণ অনূদিত এবং খন্ডাকারে মুদ্রন করেন যা সমুদয় একখন্ডে বাঁধাই করা হয়।
১২ খন্ডে সম্পূর্ণ কোরআনের মূল্য ছিল আড়াই টাকা যা তখনকার একজন প্রাইমারী প্রাথমিক শিক্ষকের মাসিক বেতনের সমতুল্য। ১৮৯৮ সালে কলকাতায় দেবযন্ত্রে বের হয় দ্বিতীয় সংস্করণ এবং ১৯০৮ সালে কলকাতার মহাগঙ্গা প্রেস থেকে বের হয় তৃতীয় সংস্করণ। তাঁর অনুবাদের প্রশংসা করে কলকাতা মাদ্রাসার আরবি শিক্ষক আহমদুল্লাহ চিঠিতে জানান ‘পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের গভীর অর্থ প্রচারে সাধারণের উপকারে হইয়াছেন সেজন্য আপনাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।’ ১৮৭৬ সাল থেকে ১৮৮১ মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় প্রথম খন্ড সম্পাদন একটি দুরূহ কাজ সন্দেহ নেই।
মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ গিরিশচন্দ্রের ওই অনুবাদ কর্মটিকে অষ্টম আশ্চর্য বলে অভিহিত করেন। ব্রাহ্মধর্মের নববিধান মন্ডলির ধর্ম প্রচারক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন বাংলা ভাষায় কোরআন শরিফের সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও টীকা-টিপ্পনি দীর্ঘ চার বছরে শেষ করেন এবং ১৮৮১ সালে প্রকাশ করেন। গিরিশচন্দ্র সেন বাংলা ভাষায় প্রথম ইসলাম ধর্মীয় অনেক ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণেতা। তাঁর লিখিত মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবনচরিত্র প্রকাশিত হয় ১৮৮৬ সালে।
গিরিশচন্দ্র নারীদের নিপীড়ন ও নির্যাতন প্রত্যক্ষ করে নারী শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেন। ১৮৯৫ সাল থেকে বিনা পারিশ্রমিকে একনাগাড়ে ১২ বছর নারীদের জন্য পারিবারিক মাসিক পত্রিকা মহিলা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তাঁর মাতা পুত্রের সম্পর্ক ছিল। যদিও পুত্রের বয়স দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। তিনি গিরিশচন্দ্র সেনকে মুসলমান-ব্রাহ্ম বলে অভিহিত করতেন। গিরিশচন্দ্র ১৮৬৩ সালে নিজ গ্রাম পাঁচদোনায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
পিতার মৃত্যুর ৫৫ বছর পর ১৮৯৭ সালে গিরিশচন্দ্র সেনের মা জয়কালী দেবী মৃত্যুবরণ করেন। শুধু বংশ মর্যাদা কিংবা ধনে-জ্ঞানে-গুণে নয় তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন দিকে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় রেখেছেন। তাঁর ভাগ্নেকুল ছিলেন শিক্ষা-দীক্ষা আর মান গৌরবে জগদ্বিখ্যাত। তাঁর বোন অন্নদাসুন্দরীর ঢ়র আলোকিত করেছিলেন পূর্ববঙ্গের প্রথম আইসিএস ও ইংল্যান্ডের হাউস অফ কমন্সের প্রথম ভারতীয় সদস্য স্যার কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্ত। পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহের প্রথম সিভিল সার্জন ছিলেন অরেক ভাগ্নে প্যারীমোহন গুপ্ত। সংগীত জগতের পঞ্চরত্নের অন্যতম অতুলপ্রসাদ সেনও ছিলেন এদের ভাগ্নে যিনি অতুল প্রসাদী সংগীতের জনক। অতুল প্রসাদ সেনের মেশতুতো বোন সরলা গুপ্তের মেয়ে ছিলেন সুপ্রভা রায় যার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র সত্যজিৎ রায়। সতজিৎ রায়ের জন্ম কলকাতায় হলেও তাঁর পিতামহ প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এবং পিতা শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায় ছিলেন তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার সন্তান।
জীবদ্দশায় ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ৫৯টি বাংলায় এবং ৭টি উর্দু বই লেখেন। তবে কোরআন শরিফ ছাড়াও তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) থেকে শুরু করে অনেক নবী-রাসুল এবং সাধ্বী মুসলমান নারীর জীবনীসহ ইসলাম ধর্মীয় ২৫টির মত বই রচনা ও অনুবাদ করেন। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের উক্তি ও জীবনী নিয়ে লেখা গ্রন্থ। তার গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম সংযোজন অনুবাদ তাপসমালা। এতে মোট ছয়টি খন্ডে গিরিশচন্দ্র সেন ৯৬ জন মুসলিম মনীষীর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাদের সাধনা তুলে ধরে বাংলা ভাষী মুসলমানসহ পাঠক হৃদয়ে আলোকরশ্মি ছড়ান। গিরিশচন্দ্র সেনের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলির নিদর্শন স্বরূপ বাংলা একাডেমি গিরিশচন্দ্রের হারিয়ে যাওয়া বইগুলি প্রকাশ করতে পারে। গিরিশচন্দ্র সেন ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, গবেষক ও ভাষাবিদ। আবার ব্রহ্মধর্ম প্রচারে ভাই খেতাবে ভূষিত হন আর বাংলায় কোরআন-হাদিসের প্রথম অনুবাদক হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট হতে লাভ করেন মৌলভী খেতাব। তাঁর এই বিখ্যাত কর্ম হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে তোলে। ১৮৯৯ সালে ভাই গিরিশচন্দ্র সেন সম্পাদিত উইলে তিনি তার বইয়ের লেখার লভ্যাংশের তিন চতুর্থাংশ পাঁচদোনার দুঃখী বিধবা-নিরাশ্রয় বালক-বালিকা, দরিদ্র বৃদ্ধা ও নিরুপায় রোগী এবং নিঃসম্বল ছাত্র-ছাত্রীদের অন্ন-বস্ত্র ও চিকিৎসার জন্য ব্যয় করার নির্দেশ দেন। ১৯০৫ সালে তাঁর লেখা আত্মজীবন প্রকাশিত হয়। এই নিবেদিত প্রাণ মনীষী ১৯০৮ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৬ বছর বয়সে ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে তিনি বেঁচে আছেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার জায়গায় সকলের হৃদয়ে। ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

Print Friendly, PDF & Email