হেফাজত ইস্যুতে 'হার্ড লাইনে' আওয়ামী লীগ - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

হেফাজত ইস্যুতে ‘হার্ড লাইনে’ আওয়ামী লীগ

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবার বাংলাদেশ সফরে আসেন গত ২৬ মার্চ। এ সময় হঠাৎ করে বিএনপি-জামায়াতের ইন্ধনে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে হেফাজতের নেতার্কর্মীরা। পুরো দেশে চালায় তান্ডব। তাদের তান্ডবে নিদ্রা ভঙ্গ হয় সরকারের। চট্টগ্রাম, হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপিও হেফাজতের কায়দায় সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করে। তবে তাদের তান্ডেবের জবাব দিতে হার্ড লাইনে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ বিষয়ে ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, হেফাজতের তান্ডবের পেছনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। বিএনপি নেত্রী নিপুন রায়ের ফোনালাপ এবং দলটির সিনিয়র নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এর সত্যতা ফুটে উঠেছে। শুধু তাই নয়, হেফাজতের নামে মৌলবাদী শক্তির তৎপরতা দেশ ও জণগনের জন্য হুমকি। এই অপশক্তির পেছনের ইন্ধনদাতাদেরও খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছে আওয়ামী লীগের হাই কামান্ড।

সূত্র মতে, ফাঁস হওয়া ফোনালাপে হেফাজতের কর্মসূচীতে ঢুকে গাড়ি পোড়াতে নির্দেশ দেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুন রায়। এই ফোনালাপ গোয়েন্দাদের হাতে যাওয়ার পর রায়েরবাজারের বাসা থেকে নিপুন রায়কে গ্রেফতার করে র্যাব। দেশের কয়েকটি এলাকায় হেফাজত কর্মীদের সরকারি ও বেসরকারি অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নি সংযোগের পেছনে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত-শিবির কর্মীরা সক্রিয় ছিল বলে সন্দেহ ক্ষমতাসীনদের।

তারা বলছেন, রাজনীতির মাঠে নিজেদের শক্তি হারিয়ে এখন অন্যের ওপর ভর করে ফায়দা নেয়ার অপচেষ্টা করছে বিএনপি-জামায়াত জোট। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা তা অব্যাহত রাখতে স্বাধীনতা বিরোধী সব গোষ্ঠীকে কঠোরভাবে দমনের জন্য হার্ড লাইনে রয়েছে আওয়ামী লীগ। তাই দলীয় হাই কমান্ড থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগের নেতাদের স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জন্য নিদের্শনা দেয়া হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় ইতোমধ্যে হেফাজত, বিএনপি, জামায়াত সন্তাসীদের চিহিৃত করার জন্যও নিদের্শনা দেয়া হয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় নিদের্শনা অনুযায়ী তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, গত ২৬ মার্চ সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসেন। ওই দিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিভিন্ন এলাকায় তান্ডবও চালায় তারা। তাদের বাধা দেয়া হলে পুলিশের সঙ্গেও দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ায় তারা। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তারা হারতালের নামে তান্ডব চালায়। টানা কয়েকদিন চলে তাদের তান্ডব। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এ সব সহিংসতার ঘটনায় ঢাকায় হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ ১৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে সন্তাসীদের চিহিৃত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কঠোর নিদের্শনা দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও গত ৩ এপ্রিল বিকেলে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্ট নামের একটি হোটেলে এক নারীসহ অবরুদ্ধ হওয়ার পর ব্যাপক ভাঙচুর করেন তার কর্মী-সমর্থকরা। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে দায়ী করে রাতেই উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি হাজি সোহাগ রনির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালান তারা। ওই সময় ঘটনাস্থলে গিয়ে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) টিএম মোশাররফ হোসেন। এ সময় ওই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন মামুনুল হক।

এ ঘটনায় গত ৪ এপ্রিল রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। একদিন পর সোমবার (৫ এপ্রিল) রাতে নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) টিএম মোশাররফ হোসেনকে খুলনা পুলিশ রেঞ্জে বদলি করা হয়।

এদিকে, আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের মধ্যে থাকা বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজত সন্ত্রাসীদের চিহিৃত করাও হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ইউনিয়ন ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ও ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতিকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিনকেও অব্যাহতি দেয়া হয় বলে জানা গেছে।

এদিকে, বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে হেফাজতের তান্ডবে ভাঙচুর হওয়া আওয়ামী লীগের কার্যালয়, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুই নেতার বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ।

পরিদর্শন শেষে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় মদিনা টাওয়ারে একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সহিংসতায় জড়িত হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মী সবাইকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সরকার ইতোমধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রত্যেক জেলায় ও উপজেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করতে প্রশাসনকে সহয়তা করার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির হোক আর হেফাজত বা বিএনপিই হোক জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপশক্তিকে রোধ করা হবে।হেফাজত ইসলামের এমন তাণ্ডব অরাজকতা মেনে নেওয়া যায় না।

হানিফ আরো বলেন, মামুনুল হকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ভাঙচুর চালিয়েছে তারা রেহাই পাবে না। হামলাকারীদের তালিকা করার জন্য তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ধর্মের নামে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত বরদাস্ত করা হবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা ধর্মের নামে তাণ্ডব চালায় তাদের আঘাতের পাল্টা আঘাত করা হবে। এজন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন তিনি। কোন অনৈতিক সহিংসতা সরকার বরদাশত করবে না। যারা ধর্মের নামে অরাজকতা করে তাদের হাত থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে হবে। ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মের নাম করে অধর্মের কাজ করছে। এসব ব্যবসায়ীদের হাত থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে হবে। হেফাজতের ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা যারা হামলার শিকার হয়েছেন তারা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করুন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বুধবার তার সরকারি বাসভবনে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, হেফাজত ইসলাম নামে একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দেশের বিদ্যমান স্বস্তি এবং শান্তি বিনষ্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে অব্যাহত তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে তা সহনশীলতার সব মাত্রা অতিক্রম করেছে।আগুন নিয়ে খেলবেন না। আগুন নিয়ে খেলতে গেলে সে আগুনে আপনাদের হাত পুড়ে যাবে।

জনগণের জানমালের সুরক্ষা দিতে শেখ হাসিনা সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছে বলেই প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির বিপরীতে আওয়ামী লীগ এখনো দায়িত্বশীল আচরণ করছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, ভূমি অফিসে আগুন দিয়ে জমি জমার গুরুত্বপূর্ণ দলিল, খতিয়ান, নামজারি রেকর্ড ছাই হয়ে গিয়েছে, ভূমির প্রয়োজনীয় দলিল নথিপত্রের অভাবে বংশপরম্পরায় মামলা-মোকদ্দমায় লড়তে হবে। সুতরাং যারা এসবের সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিএনপি-জামায়াত নৈরাজ্য সৃষ্টি করে ধ্বংসাত্মক আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে ২০১৩- ১৪ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার ঘৃন্য খেলায় মত্ত হয়েছিল, তাদের সাবধান করে দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আঘাত আসলে প্রতিঘাত করতে জানে এবং আক্রমণ করলে পাল্টা আক্রমণও করতে জানে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিবেন না। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর অবমাননা জাতি আর সহ্য করবে না। বঙ্গবন্ধুর ছবি ও ভাস্কর্যের ওপর যারা হামলা করেছে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাদের এ ধৃষ্টতার জবাব দেবে।

ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগসহ সব সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উসকানিদাতাদের তালিকা করে এদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

যারা দেশব্যাপী তাণ্ডব চালিয়েছে বা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে তাদের সতর্ক করে দিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, দেশের জনগণের ধৈর্য ও সহনশীলতার একটা সীমা আছে! সীমা অতিক্রম করলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

Print Friendly, PDF & Email