করোনা হাসপাতালে আইসিইউ বেড ভাড়া দুই হাজার টাকা - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

করোনা হাসপাতালে আইসিইউ বেড ভাড়া দুই হাজার টাকা

সাইফুর তালুকদার, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সিলেট : নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে বন্দী সিলেট সদর শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতাল। স্বাস্থ্যসেবার বদলে এ হাসপাতালকে ট্রেড সেন্টার বানিয়ে ফেলেছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে এ সিন্ডিকেট দৈনন্দিন কামাই করে চলেছে লাখ লাখ টাকা। হাসপাতালের কর্তাব্যক্তি, ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা কর্মচারী সহ সকলে মিলেই তৈরি এ সিন্ডিকেট।

সিলেট সদর শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালটি বর্তমান বৈশ্বিক মহামারীকালে সিলেট বিভাগের জন্য করোনা আইসোলেশন সেন্টার। বর্তমানে সিলেট বিভাগের করোনা রোগীদের একমাত্র ভরসা এই হাসপাতাল। সারাদেশে করোনা মহামারি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সরকার এক সাপ্তহের লকডাউন ঘোষণা করেছে। এমনকি সিলেটসহ দেশের মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।

কিন্তু সিলেট সদর শামসুদ্দীন হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশ করলে মনে হয় এখানে করোনা চিকিৎসার বদলে করোনা চাষই করা হচ্ছে। করোনার সুবাদে হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগে গজে ওঠেছে অনিয়ম ও দূর্নীতির গাছপালা। এক কথায় এই হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের এটন্ডেন্টরা একটি সিন্ডিকেট চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। চিকিৎসার বদলে রোগী ও এটেন্ডেন্টদের রক্ত চুষে খায় এ সিন্ডিকেট।

অভিযোগে প্রকাশ, এই হাসপাতালে করোনা আইসিইউ ওয়ার্ড চালু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি রোগীর নিকট থেকে ২ হাজার টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু এই টাকার কোন রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। সরকারি ভাবে এই টাকা গ্রহনের কোন আদেশও দেওয়া হয়নি। এরপরও নিয়ম নীতির কোন তোয়াক্কা না করেই এ টাকা দিতে রোগীদের বাধ্য করা হচ্ছে।

জানা যায়, আইসিইউ’র আদায়কৃত দেড় লাখ টাকা জমা ছিলো একজন সিনিয়র স্টাফ নার্সের কাছে। কিন্তু ওই স্টাফ নার্সের কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে যান হাসপাতালের উপ-সেবা তত্ত্বাবধায়ক নেহারি রাণী দাশ। এর পর থেকে এই টাকার আর কোন হদিস মিলছে না। আইসিইউ ওয়ার্ডে অবস্থা এমন, যেখানে রোগী দুরের কথা কোন মানুষই থাকা দায়। ওয়ার্ডে এসি আছে ঠিকই কিন্তু নামে এসি কার্যত কিছুই নয়। এছাড়া হাসপাতালে রয়েছে স্বাস্থ্য সামগ্রীরও তীব্র সংকট।

রোগাীদের অভিযোগ-টাকা নিচ্ছেন ভালো কথা নার্সিং সেবা ঠিকমতো দেননি। এত বড় আইসিইউ ওয়ার্ডে ডিউটি করেন মাত্র একজন জুনিয়র স্টাফ নার্স। ভুলেও সিনিয়রদের পা পড়ে না আইসিইউ ওয়ার্ডে। চার-পাঁচ দিন পর একজন রোগীর বিছানা চাদর পাল্টানো হয়। নার্সদের সাথে ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না রোগীর স্বজনরা। কথা বলতে গেলে তাদের সাথে করা হয় চরম দুর্ব্যবহার।

এদিকে, সিলেট সদর শামসুদ্দীন হাসপাতালের ১১ নং কক্ষে প্যাথলজিস্টরা দায়িত্ব পালন করলেও সেখানে তাদের সাথে নিয়মিত কাজ করছেন নগরের ওসমানী হাসপাতাল রোডস্থ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এর একজন প্যাথলজিস্ট।

সরেজমিনে রোগী ও তাদের এটেন্ডেন্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, হাসপাতালের কোন রোগীকে যদি প্যাথলজিপরীক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে পপুলার থেকে বাধ্যতামূলক পরীক্ষা করাতে হবে। কারণ সেখান থেকে কোন পরীক্ষা করলে ৩০% পান মেডিকেলের ওয়ার্ড ইনচার্জরা। এজন্য নিয়মিত পপুলার ডায়াগনস্টিক এর একজন প্যাথলজিস্ট এখানে তার দায়িত্ব পালন করেন। হাসপাতালের কোন প্যাথলজিস্ট-নার্স রোগীর পরীক্ষার কোন স্যাম্পল সংগ্রহ করে দেননি। পপুলার ছাড়া রহস্যজনক কারণে অন্য কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাথলজিস্ট ওই হাসপাতালে আসতে পারেননি। যার ফলে রোগীরা বাধ্য হয়ে পপুলারে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। দেখা গেছে ইবনেসিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যে টেষ্ট ৪ হাজার টাকায় পরীক্ষা করা যায়। কিন্ত প্যাথলজিস্টরা ওই হাসপাতালে না আসাতে রোগীরা বাধ্য হয়ে পপুলার থেকে ৭ হাজার টাকায় ওই টেষ্ট করিয়ে আনতে হয়।

অভিযোগে প্রকাশ হাসপাতালের খাবারের তালিকায় ভূয়া রেজিষ্ট্রিশন দেখিয়ে ২৩ রোগীর নামে গায়েব করা হয়। এই অতিরিক্ত রোগীর নামে খাবার গুলো কে খায়? এ নিয়ে হাসপাতালের নার্স ও স্টাফদের মধ্যে নানাবিধ প্রশ্ন দেখা দেয়।

আইসিইউ’র রোগীদের কাছ থেকে আদায়কৃত দেড়লাখ টাকা আত্মসাতের ব্যাপারে শহীদ শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতালের উপ-সেবা তত্ত্বাবধায়ক নেহারি রাণী দাশ-এর মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি এই বিষয়ে কোন কথা বলতে চান নি। তিনি বলেন, হাসপাতালের আরএমও ডা. সুশান্ত কুমার মহাপাত্র তাকে কথা বলতে বারণ করেছেন।

শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুশান্ত কুমার মহাপাত্র হাসপাতালের আইসিইউতে রোগীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে গ্রহণের কথা স্বীকার করে বলেন, আইসিইউ-এর যন্ত্রপাতি সচল রাখতে এবং অতিরিক্ত ব্যায় নির্বাহের নিমিত্তে এ টাকা গ্রহণ করা হয় এবং এ খাতেই তা’ ব্যয় করা হয়ে থাকে। কোন রসিদ দেওয়া না হলেও একটি খাতায় হিসাব রাখা হয় এবং কর্তব্যরতরা এর হিসাব ম্যান্টেইন করে থাকেন। তবে এই টাকা নেয়ার আইনগত কোন বৈধতা নেই বলেও তিনি স্বীকার করেন।
পরীক্ষা নিরীক্ষার যে যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থা হাসপাতালে নেই তা বাইর থেকে করিয়ে আনতে বলা হয় সত্য, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট ডায়োগনিষ্টিক সেন্টার থেকে করিয়ে আনতে বলা হয় না। কোন ডায়াগনিষ্টিক সেন্টারের সাথে এধরনের চুক্তি বা যোগাযোগী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নেই।

জমা হওয়া টাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই খাতে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা উপ-সেবা তত্ত্বাবধায়ক নেহারি রাণী দাশ এর কাছে জমা ছিল। কিন্তু এখন তিনি টাকা হারিয়ে গেলে বলে দাবী করছেন। একারনেই এই টাকা এখন পাওয়া যাচ্ছেনা।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু রঞ্জন দাস বলেন, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামত করার জন্য ডিসচার্জ হওয়া রোগীরা স্বেচ্ছায় কিছু টাকা দিয়েছেন বলে আমি শুনেছি। গত সপ্তাহেই প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা ব্যায়ে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামত করা হয়েছে। ফান্ডে টাকা নেই, এখন কিভাবে এই এই ব্যায় পরিশোধ করা হবে।

অতিরিক্ত খাবার বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ডাক্তাররা ডিউটি করেন। তাদের তো খাবারের প্রয়োজন হয়।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রি. জে. ব্রিগে: জেনারেল ব্রায়ান বঙ্কিম হালদার বলেন, আমি তাদেরকে বলেছি কোন করোনা রোগী যদি ডিসচার্জের সময় স্বেচ্ছায় ১০০০/২০০০ টাকা ডোনেট করে তবে নেয়ার জন্য। এবং এজন্য একটি রেজিষ্ট্রার ম্যান্টেইন করার জন্য। কেউ স্বেচ্চায় না দিলে তাকে জোর করা যাবেনা, এমনকি প্রতিদিনও এই টাকা নেয়া যাবেনা।

রোগীদের কাছ থেকে টাকা রাখান কোন সরকোরী বিধান নেই জানিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালের ৪টা মেশিন খারাপ ছিল। এই টাকা দিয়ে এগুলি মেরামত করা হয়েছে। আইসিইউতে নতুন করে ২টি বেড বাড়ানো হয়েছৈ। ২টি ভ্যন্ডিলেটর মেশিন নষ্ট ছিল, তা মেরামত করা হয়েছে। সরকারকে এসব বিষয় বললে তিন মাসেও মেরামত করা সম্ভব হত না। এই হাসপাতালে এখন ১৬টি আইসিইউ বেডই এখন স্বচল।

বাহিরে থেকে পরীক্ষা করে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালে সব পরীক্ষা করা সম্ভব হয়না। সরকারের পক্ষ থেকে সকল মেশিন দেয় সম্ভব হয়নি। এজন্য কিছু টেষ্ট বাহিরে থেকে করে আনতে হয়। রোগীরা তাদের নিজেদের পছন্দমত যেকোন যায়গা থেকেই করিয়ে আনতে পারে। ডাক্তাররা সেই রিপোর্ট এটসেপ্ট না করার কথা নয়।

শুধুমাত্র পপুলার থেকে টেষ্ট করার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি যে একেবারেই মিথ্যা বা সম্পূর্ণ সত্য তা নয়।

Print Friendly, PDF & Email