প্রতিদিন ফিরে দেখি ১৯৭১ - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

প্রতিদিন ফিরে দেখি ১৯৭১

মোহন হাসান : ১৯৭১ সালে খুলনা শহরের যে এলাকাটিতে আমাদের বসবাস সেখানে বাঙালি ছিল সংখ্যালঘু। তখন খালিশপুর হাউজিং এস্টেটের নতুন ও পুরোনো কলোনীতে বাঙালির সংখ্যা শতকরা হিসাবে ১০/১৫ জনের বেশি ছিল না। তারমধ্যে আবার দেশ বিভাগের সময় ভারতের পশ্চিমবাংলা থেকে আসা বাঙালিই ছিল বেশি। তারা উর্দু ভালো বুঝলেও আমরা বুঝতাম না। বাবা ডা. আব্দুল মতলেব খান (ন্যাশনাল ফার্মেসি) ব্রিটিশ আমলে যশোর মেডিকেল স্কুলে পড়ার আগে চব্বিশ পরগনায় হাই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। সে কারণে উর্দু বুঝতেন। তো ১৯৭১-এর মার্চ, যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। কিন্তু উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে খুলনার খালিশপুর। আজ এখানে কাল সেখানে লাশ পড়ে।

পরে বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। আমাদের চারপাশেই ছিল বিহারি, সরে পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। যেকোনো মুহূর্তেই প্রাণ সংহারের আশঙ্কা। ঘটনাও শেষ পর্যন্ত সেরকম ঘটে। আমার দুই চাচা ও দুই আত্মীয় আমাদের বাসা থেকে নিখোঁজ হন। আজও তাদের সন্ধান মেলেনি। অনেক বছর পরে আমি যখন পিপলস জুট মিলস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র তখন আমাদের বাড়ি এন,ডি,৪৯-৫০-এর ঠিক পেছনের বাড়িটি পুননির্মাণের সময় বেশকিছু কঙ্কাল পাওয়া যায়। তবে জানা যায়নি ওগুলোর মধ্যে আমার চাচা ও আত্মীয়দের কঙ্কাল ছিল কি না।

তবে ওই কঙ্কাল দেখে জাকির ও বাড়ির অন্যরা খুব কেঁদেছিল। জাকির আমার ছোট চাচার একমাত্র সন্তান। আমাদের সঙ্গেই বড় হয়েছে। সেও পিপলস স্কুলেরই ছাত্র। ক্লাস সিক্স পর্যন্ত এ স্কুলে পড়েছে। জাকির চাচাকে দেখেনি। ১৯৭১ সালেই জাকিরের জন্ম নানা বাড়িতে। ছোট চাচা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জাকিরকে দেখতে যাওয়ার ঠিক এমন সময়ই যুদ্ধের সূত্রপাত। চাচার আর জাকিরকে দেখতে যাওয়া হয়নি। কঙ্কাল পাওয়ার ঘটনায় মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুই জাকিরকে এখান থেকে নিয়ে যা। ও কিন্তু কঙ্কাল দেখে কেমন করছে।’ আমি মা’র কথামত জাকিরকে নিয়ে গেলাম। শিশুদের যেমন নেবেন চুষ কিংবা চকলেট ধরিয়ে দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয় আমিও তেমনি ছল করে জাকিরকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম। আমার উদ্দেশ্য.ঘটনাটি যেন ওর ভেতর কোনো কৌতুহল সৃষ্টি না করে। কিন্তু আমার সে চেষ্টা সফল হয়নি বুঝতে পারি ওর কান্না দেখে। কঙ্কাল আবিষ্কারের ঘটনা যখন ঘটে তখন আমি স্কুলে পড়ি। থাকি অবহেলিত শিল্পাঞ্চলে। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ হতদরিদ্র। শিক্ষা-দীক্ষায়ও অনেক পিছিয়ে। সেখানকার খুব কম খবরই তখন পত্রিকা অফিসে পৌঁছাতো। ফলে কঙ্কাল আবিষ্কারের ওই ঘটনা তখন কোনো মিডিয়ায় আসেনি।

এখনকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শ্রমিকের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে উচ্চ শিক্ষিত হয়েছেন। শিল্পপল্লী খালিশপুরে এখন সাংবাদিকের সংখ্যা বহু। বয়স বাড়ার পর মনে হয়েছে, কঙ্কাল আবিষ্কারের ঘটনা যদি এখন ঘটতো তাহলে তা নিশ্চয়ই পত্রিকার খবর হতো। কী জানি- ওই বিহারি বাড়িটিকে হয়তো বধ্যখানা হিসেবে শনাক্তও করা হতো। ওই বাড়িতে কত বাঙালিকে গুম করে লাশ চাপা দেয়া হয়েছিল, কে জানে ! বর্তমানে ওই বাড়িতে কারা থাকে জানা নেই। উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর ঢাকায় চলে এসেছি। লেখাপড়া শেষ করে আর ফেরা হয়নি।

যাহোক- মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই খালিশপুরে ভয়াবহ উত্তেজনা বিরাজ করছিল। একদিন একদল বিহারি হানা দিল আমাদের বাড়িতে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা প্রথমে আব্বাকে খুঁজলো। ভাগ্যিস, ওই ঘটনার অল্প আগেই ছোট চাচার এক বিহারি সহপাঠি রিয়াজ রোগী দেখার কথা বলে আব্বাকে নিয়ে যান তাদের বাড়িতে। মা হামলাকারীদের বললো, ‘ডাক্তার সাহেব রোগী দেখতে গেছেন।’ তখন দলের যে মাথা সে বললো, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি, এই বাড়িতে অস্ত্র আছে। আমরা বাড়িটি সার্চ করবো।’ মা জানালার ফাঁক দিয়ে বললেন, ‘এটা ডাক্তার বাড়ি, এখানে অস্ত্র আসবে কোত্থেকে।’

কিন্তু তারা মা’র কথার কোনো গুরুত্বই দিল না। জানোয়ারগুলো হৈ হল্লা করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। আমরা ভাই-বোনেরা তখন মার সঙ্গে একটা রুমে ভয়ে জবুথবু হয়েছিলাম। ওরা চলে যাওয়ার পর বুঝলাম, আমাদের বাড়িটা লুট হয়ে গেছে। ওরা অস্ত্র খোঁজার নামে নগদ টাকা-কড়িসহ বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নিয়ে যায়। বাড়ি লুট হওয়ার পরপরই ছোটচাচার ওই বিহারি সহপাঠি গোপনে আমাদের নিয়ে গেলেন তাদের বাড়িতে। ছোটচাচা আবদুর রশিদ খান তখন বাইরে। তিনি চিত্রালী বাজারে গিয়েছিলেন কি যেন কিনতে।

ছোট চাচার সঙ্গে ছিলেন বড়চাচা, রফিক স্যার ও দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়। বড়চাচা মানে আব্বার চাচাতো ভাই কাউসার খান। তিনি বঙ্গবাসী স্কুলের কাছে মেসে থাকতেন। পিপলস জুট মিলে চাকরি করতেন। বাঙ্গালি-বিহারি দাঙ্গা শুরু হলে তিনি মেস ছেড়ে আমাদের বাসায় ওঠেন। সঙ্গে আনেন তার সহকর্মী, দূরসম্পর্কের ওই আত্মীয়কে। রফিক স্যারও আমাদের আত্মীয়, তার গ্রামের বাড়ি নড়াইলে। তিনিও মিলে চাকরি করতেন। তিনি আমাদের বাসাতেই থাকতেন। বিনিময়ে আমাদের ভাই-বোন সবাইকে পড়াতেন।

মা ছোটচাচার বিহারি সহপাঠি রিয়াজ চাচাকে বললেন, বাজার থেকে ফিরলে ওদেরও এখানে এনো। রিয়াজ চাচা পরে জানালেন, ওরা এখানে এসে আত্মগোপন করতে চায় না, ওরা ওই বাড়িতেই থাকবে।

রিয়াজ চাচার বাড়িতে আমাদের থাকতে দেয়া হয় একটা খুপড়ি ঘরে। সেখানে ছিল মশার খুব উপদ্রব। হিংস্র মশা। কামড়ালে গা জ্বলতো। মশার অত্যাচারে কি দিনে কি রাতে কোনো সময়ই স্বস্তি ছিল না। আমার বছর তিনেকের ছোট মিলন তখন কথা বলা শিখছে। ও মাঝে-মধ্যে বলে উঠতো, ‘দয়বাংলা’। ‘জয়বাংলা’ শব্দটা ও শুদ্ধ করে বলতে পারতো না। মিলন কথা শুরু করলেই বড়আপা ওর মুখ চেপে ধরতো। বড়আপা হাসনা হেনা তখন ক্লাস টেনে পড়েন ক্রিসেন্ট জুট মিলস হাইস্কুলে। আর ছোট আপা ফাতেমা খান বকুল পড়েন ক্লাস ফাইভে একই স্কুলে। মিয়াভাই আবুল হাসান খান বাবু এলিজাবেথ মার্বেল প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস টুতে পড়েন। বিহারি শিশুদের সঙ্গে তার মেলামেশা ছিল। তাদের সঙ্গে খেলতো। এই কারণে সে উর্দু ভাষা বুঝতো, কিছু বলতেও পারতো। আব্বা ও মিয়াভাই ছাড়া পরিবারের আর কেউ উর্দু বুঝতাম না।
কিন্তু ওই সময় উর্দু না জানা ছিল আমাদের বিপদের বড় কারণ। উর্দু জানলে আত্মগোপন সহজ হতো। অনেকেই টের পেতো না আমরা বাঙালি। কিন্তু সে উপায় ছিল না। ওই খুপড়ি ঘরে আমাদের চুপিসারে কথা বলতে হতো। তারপরও আশপাশের বিহারি কেউ কেউ টের পেয়ে যায়। রিয়াজ চাচা খবর আনেন, তাদের বাসায় তল্লাশি চালানোর হুমকি দেয়া হয়েছে। যেসব বিহারি বাঙালি নিধন করছে, তাদের কাছে নাকি ইনফরমেশন আছে রিয়াজ চাচাদের বাড়িতে বাঙালি পরিবারকে আশ্রয় দেয়ার। তারা বলেছে বাঙালি থাকলে তাদের হাতে তুলে দিতে। নইলে তল্লাশি চালাবে।

বাঙালি পাওয়া গেলে আমাদের সঙ্গে রিয়াজ চাচাকেও হত্যা করা হবে। এই ঘটনায় রিয়াজ চাচার আব্বা ও মা তো অস্থির। তাদের ভয় শেষে তাদের ছেলেটাকেই হারাতে না হয়। তাই তারা ছেলেকে চাপ দেয়া শুরু করেন আমাদের তাড়াতাড়ি বিদায় করার জন্য। তারা ছেলেকে এমন হুমকিও দেন যে, তুই কিছু না করলে আমরাই ওদের ধরিয়ে দেব। রিয়াজ চাচার আব্বা-মা আমাদের প্রতি খুব বিরক্ত, তা আমরা তাদের আচরণ থেকেই বুঝতে পারি। ওই সময় তাদের ওই আচরণ আমাদের দুঃখ-কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। আমাদের উচিত ছিল, ওই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও না থাকা। কিন্তু উপায় ছিল না। বাইরে বের হলেই মারা পড়তে হবে। জেনে-বুঝে কে মারা পড়তে চায়। জান বাঁচানো ফরজ। অতএব রিয়াজ চাচার আব্বা-মায়ের ওই আচরণ হজম না করে উপায় ছিল না।

আব্বা রিয়াজ চাচাকে বললেন, আমার ভাইদের এনে দাও-আমরা আজই চলে যাবো। রিয়াজ চাচা ঘুরে এসে জানালেন, তারা ওই বাড়িতে নেই, তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কথা শুনে আব্বা, মা ও বড় আপা কাঁদতে শুরু করলেন। রিয়াজ চাচা বললেন, এখন কান্না-কাটি করলে বিপদ বাড়বে, আশপাশের লোক ছুটে আসবে। চাচাদের খোঁজে দুদিন পার হলো। রিয়াজ চাচা জানালেন, অনেক খুঁজেও তাদের পাওয়া গেল না। তিনি আব্বাকে বললেন, আপনারা আজই চলে যান। আজ রাতেই বাড়ি তল্লাশির আশংকা।

আমি আপনার ভাইদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো। আমরা তৈরি হলাম ওই রাতেই রিয়াজ চাচাদের বাাড়ি ছাড়ার। চাচাদের রেখেই আমাদের বের হতে হলো। আব্বা, মা ও বড় আপা বোরকা পরলেন। রিয়াজ চাচা একজন বিহারিকেও আমাদের সঙ্গে দিলেন, যেন শত্রুর কবলে পড়লে উর্দুতে ঠিকভাবে উত্তর দেয়া যায়। ওই বিহারি আমাদের এগিয়ে দেন বিহারি নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমানা পর্যন্ত। আমরা পাওয়ার হাউসে (খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্র) ঢোকার পর দেহে যেন প্রাণ ফিরে আসে। পাওয়ার হাউস এলাকা ছিল বাঙালি নিয়ন্ত্রিত। সেখানে আমাদের আশ্রয় জোটে আব্বার চেনা-জানা এক চাচার বাসায়। তিনি পাওয়ার হাউসেই কাজ করতেন। সেখান থেকে দৌলতপুরের পাবলায় আব্বার এক বন্ধুর বাসায়। তারপর যশোরের বসুন্দিয়া ও জগন্নাথপুরে দুই ফুঁফুর বাড়িতে। এভাবে গ্রামে পৌঁছতে বেশ কিছু দিন লেগে যায়।

আমাদের গ্রাম যশোরের মণিরামপুর থানার মুন্সি খানপুর। ফুফু বাড়ি থেকে খবর পাঠানো হয় গ্রামে। কয়েকদিন পর সেজ চাচা রোস্তম খান এসে ঘোড়া গাড়ি করে আমাদের মেঠো পথে গ্রামে নিয়ে যান। গ্রামে গিয়ে শুনলাম, মেজ চাচা লোকমান খান আমাদের খোঁজে বেরিয়েছেন। আব্বার চাচাতো ভাই মালেক চাচাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মালেক চাচা তখন দূরন্ত কিশোর, ক্লাস এইটে পড়েন বাড়ির পাশেই খামারবাড়ী জুনিয়র হাইস্কুলে। তার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে নানা জনের নানা মত। কারো ধারণা, কেউ তাকে মেরে ফেলেছে। আবার কারো ধারণা, সে হিন্দুদের সঙ্গে ভারতে চলে গেছেন।
আমরা গ্রামে ফেরার পর দেখলাম, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দলে দলে ভারতে চলে যাচ্ছেন। যেসব হিন্দু পরিবারে অসুস্থ ও বৃদ্ধ ছিলেন তাদের কষ্টের সীমা ছিল না। যত বড় বিপদই হোক, অসুস্থ ও বৃদ্ধ মা-বাবাকে তো আর ফেলে যাওয়া যায় না। তাই তাদের বয়ে নেয়া হচ্ছিল শিকে লাগানে বাকে করে। সে সময় শিকে-বাকের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বাঁশ দিয়ে তৈরি বাকের দু’পাশে শিকে ঝুলিয়ে মালামাল বহন করা হয়। এখন প্রত্যন্ত গ্রামেও যান্ত্রিক গাড়ির প্রচলন ঘটেছে। তাই শিকে-বাকের প্রচলন অনেক কমে গেছে। তো শিকে-বাকে মালামাল বহন আর মানুষ বহন এক কথা নয়। শিকে-বাকে যাদের বহন করা হচ্ছিল তারা খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন।

তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন, যেসব নারী ছিলেন সন্তান-সম্ভবা। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেয়া তাদের জন্য ছিল যেমন অবর্ণনীয় কষ্টের, তেমনি ঝুঁকির। আমাদের পাড়াতেই সন্তান প্রসবের দুটি ঘটনা ঘটে। একটি ইউসুফ খাঁর বাড়িতে। অন্যটি খামার বাড়ী স্কুলের মাঠে। এরকম নানা বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে জনস্রোত বয়ে যাচ্ছিল ভারতের দিকে।

আমাদের গ্রামের কমবেশি দশ মাইল উত্তর-পূর্বে মশিহাটি, হিন্দুপ্রধান এলাকা। ওই অঞ্চলের হিন্দুরা ভারতে যাচ্ছিলেন আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়েই। রাস্তার পাশেই আমাদের আম বাগান হয়ে উঠেছিল তাদের ক্ষণিকের বিশ্রামাগার। যাদের সঙ্গে চিড়া-মুড়ি জাতীয় শুকনো খাবার ছিল তারা তা আম বাগানে বসে খেতেন। প্রত্যেকেই ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর। এ অবস্থায় বাড়ির বড় ভাই-বোনদের দায়িত্ব পড়ে তাদের পিপাসা নিবারণের। আমাদের বাড়ির টিউবওয়েল থেকে কলস ও জগ ভরে তাদের পানি পান করানো হতো। আমাদের পাড়ায় তখন মাত্র দুটি টিউবওয়েল। একটি আমাদের বাড়িতে, অন্যটি সরকারি। অন্যটির অবস্থান ছিল রাস্তা থেকে বেশ খানিক দূরে। তখন টিউবওয়েলের ব্যবহার কম ছিল। পাড়ার প্রতি বাড়িতেই ছিল পাত কূয়া (কুপ)। কূয়ার পানি দিয়েই রান্না-বান্না ,গোসল ও ধোয়া-মোছার কাজ চলতো। প্রধানত খাবার পানির জন্যই টিউবওয়েল ব্যবহার করা হতো।

তো কাছাকাছি হওয়ার কারণে আমাদের বাড়ির টিউবওয়েল থেকেই কলস ও জগ ভরে ভারতগামী হিন্দুদের পানি পান করানো হতো। বিলাল, মূসা, সাত্তার, সিরাজ ও মিজানসহ যারা আমার সমবয়সী তাদের দায়িত্ব ছিল বড়দের সাহায্য করা। সেজ চাচা, খালেক চাচা, মতি ভাই, মোবারক ভাই, মনসুর ভাই, বড় আপা, ছোট আপা, পারুল বু, সফু বু, নূরা বু, জনু বু, মিয়াভাইসহ পাড়ার অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাদের পিপাসা নিবারণে। অনেকের ঝোলায় কোনো খাবার ছিল না। ফলে তারা একদিকে ক্ষুধার্ত, অন্যদিকে পিপাসার্ত। কিন্তু তাদের খাবার যোগানোর মতো অবস্থা আমাদের ছিল না। আমরা নিজেরাই তখন লুটপাটে নিঃস্ব। কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে এক কাপড়ে শহর থেকে গ্রামে ফিরেছি। ফলে সবাইকে ভাত খাওয়ানো সম্ভব ছিল না। বাড়ির মুরুব্বিরা সিদ্ধান্ত নেন, সবাইকে কাঁচা আমের ভর্তা খাওয়ানোর। ফলে শুরু হয়ে যায় দলবেঁধে আমপাড়া ও ভর্তা বানানোর কাজ। ভর্তা তৈরির কাজ পড়ে মেয়েদের ওপর। ওই বছর গাছে প্রচুর আম হয়েছিল। কয়েকটি গাছের সব আমই তাদের খাওয়ানো হয়।

দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামে ফিরতে লাগলেন। আমাদের পাড়ার কালাম চাচা ও আক্তার খাঁ ফিরে এলেন। ফিরে এলেন সরদার পাড়ার বজলু চাচাও। যুদ্ধে কালাম চাচার চোখের ক্ষতি হয়। তিনি জানালেন, মালেক চাচা তাদের সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু তাকে সঙ্গে আনতে পারেননি। আসলে মালেক চাচা নেই– এই ঘটনা আমাদের পরিবারের কাছে গোপন রাখেন অন্য মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু কানাঘুষায় কিছুদিন পরই তা আমরা জানতে পারি। মালেক চাচা বাড়ির কাউকে না জানিয়েই মু্ক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, বললে তাকে যেতে দেয়া হবে না। কারণ, তার তখন যুদ্ধে যাওয়ার বয়সই হয়নি।

কালাম চাচার কাছে শুনেছি, তিনি এবং মালেক চাচা বয়স বেশি দেখিয়ে ট্রেনিংয়ে নাম লেখান। মালেক চাচার গুলতি ছোঁড়ায় হাত ছিল পাকা। সেই কারণে তার গুলি ও গ্রেনেড নাকি লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। ওদিকে মেজ চাচাও ফিরে এলেন না। মেজ চাচার পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে। তারা হচ্ছেন: সালেহা, সুফিয়া, শেলি, লাভলি, লাকি, রবি ও রতন। ছোট চাচার একমাত্র ছেলে জাকির। আর কাউসার চাচা তখন পর্যন্ত বাবা হননি। যুদ্ধশেষে মালেক চাচার তো একটা খবর পাওয়া গেলো। কিন্তু অন্যদের তাও পাওয়া গেল না। দিন যায়-মাস যায়। আব্বা, মা, চাচা-চাচি, দাদা, দাদিসহ বাড়ির সবাই অপেক্ষায় থাকেন- লোকমান, কাউসার ও রশিদ ফিরে আসবে। এভাবে অনেক বছর চলে গেল। ইতিমধ্যে দাদা, দাদি, আব্বা, মা, সেজ চাচাও চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। কিন্তু নিখোঁজ চাচারা আর ফিরে আসেননি। তারপরও অপেক্ষায় থাকি এই ভেবে, তারা ফিরে আসবেন। মাঝেমাঝেই মনেহয়, কবে একদিন তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে কোথাও। টিভিতে সব কটা জানালা খুলে দেয়ার গানটি যখন বাজে- মন অস্থির হয়ে ওঠে, ফিরে দেখি ১৯৭১।

(লেখক: সদস্য বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিষ্ট্রার্ড গ্রাজুয়েট অ্যাসোসিয়েশন।)

Print Friendly, PDF & Email