পদ্মা সেতু আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

পদ্মা সেতু আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক

ড. আতিউর রহমান : কয়েক দিন আগে পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যানটি লেগেছে। দুই পারের সেতুবন্ধ হিসেবে স্টিলের কাঠামোটি এখন আমাদের জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ দেশের সংগ্রামী মানুষ দুই চোখ ভরে আমাদের আত্মশক্তির এই প্রতীকটি দেখছে। আর এত দিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা দক্ষিণ বাংলার মানুষের অন্তরে বইছে অন্য রকম এক আনন্দের ঢেউ। ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর মূল নির্মাণকাজের ৯১ শতাংশ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। হঠাৎ করে করোনা সংকট দেখা না দিলে, এ বছর উপর্যুপরি বন্যা না এলে হয়তো আরো আগেই স্প্যান লাগানোর কাজ সম্পন্ন করা যেত। শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পদ্মা সেতুর কাজটি এগিয়ে চলেছে। রাজনৈতিক, কারিগরি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়ার পথে।

দক্ষিণ বাংলার মানুষ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝেন। তাই ২০০১ সালের ৪ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে মাওয়া ফেরিঘাটের কাছেই এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু নানা ষড়যন্ত্র ও প্রতিবন্ধকতার কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল পুনর্নির্বাচিত হতে পারেনি। তারপর এই সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রাধিকার হারিয়ে যায়। ২০০৯ সালে ফের ক্ষমতায় ফিরে এসে তিনি আবার পদ্মা সেতু নির্মাণকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসেন। শুরুতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, আইডিবি এই সেতুর অর্থায়নের অংশীদার হলেও পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক যুক্ত হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণেও এই উন্নয়ন অংশীদাররা যুক্ত ছিল। তাই সরল বিশ্বাসেই বিশ্বব্যাংককে যুক্ত করেছিল বাংলাদেশ সরকার। শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাসের দাম রাখেনি এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। অযথাই একটি নোংরা বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল মনগড়া দুর্নীতির অভিযোগ তুলে।

বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসুকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীসহ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। ফলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। চলমান প্যানডেমিকসহ অনেক খাতেই বিশ্বব্যাংক এখন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে। তবে পদ্মা সেতু নিয়ে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল তার সফল সমাপ্তি ঘটে কানাডীয় আদালতে দেওয়া এক রায়ে। ওই রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয় যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির কোনো সুযোগই ছিল না।

আমাদের দুর্নীতি দমন বিভাগ, বিশেষ করে সেই সময়ে তাদের বিশেষ আইনজীবী (বর্তমানে আইনমন্ত্রী) অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের পেশাদারির প্রশংসা করতে হয়। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে খুবই কৃতজ্ঞ যে সেদিন তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন। সে যাকগে, বাংলাদেশ যে এত বড় প্রকল্পের অর্থায়ন নিজেদের সম্পদ থেকেই সম্পন্ন করতে পারে—সেটিই ছিল এই পদ্মা সেতু বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যুগে যুগে বাঙালির কাছে ইতিহাসের এই মুহূর্তটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারিগরি চ্যালেঞ্জও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমাজনের পর সবচেয়ে খরস্রোতা নদী পদ্মা। মাওয়া পয়েন্টে স্রোতের বেগ সবচেয়ে বেশি। এমন নদীতে পিলার বসানো চাট্টিখানি কথা নয়। এ বছর বর্ষাও ছিল প্রবল। বন্যাও হয়েছে কয়েকবার। তাই জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত স্প্যান বসানোর কাজ বন্ধই ছিল। বিদেশ থেকে বিরাট সব যন্ত্রপাতি আনতে হয়েছে। কারিগরি নকশা বদলাতে হয়েছে। দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের সমন্বয়ও করতে হয়েছে। প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী কারিগরি কমিটির প্রধান হিসেবে দারুণ কাজ করে গেছেন। তাঁর টিমের অন্য সদস্যদের অবদান জাতি দীর্ঘদিন মনে রাখবে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক যেসব অভিযোগ তুলেছিল, সেগুলো যে কতটা মনগড়া ছিল এ নিয়ে জামিল স্যার আমার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলাপও করেছিলেন। অধ্যাপক আবদুল মান্নান ও সুভাষ সিংহ রায়ের পদ্মা সেতু বিষয়ে সংকলিত একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় স্যার পাঠক সমাবেশে এসেছিলেন। আমিও ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম একজন অতিথি হিসেবে। সেদিনও তিনি বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আচরণের সমালোচনা করেছিলেন।

এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ। করোনা সংকটে চীনের কর্মীদের আসা-যাওয়া বেশ বিঘ্নিত হয়েছে। অনেক শ্রমিক এখনো কভিডে আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব কারণে শত চেষ্টা করেও সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করা যাচ্ছে না। তাই প্রকল্প খরচও বেড়ে যাচ্ছে। বিদেশি কন্ট্রাক্টরদের বাইরে আমাদের দেশি নির্মাণ সংস্থা আব্দুল মোমেন গ্রুপও পদ্মা সেতু নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল এসব কাজ সমন্বয় করছে। সেনাবাহিনীর ওই দলের পক্ষ থেকে বছর দুই আগে আমাকে প্রকল্পটির কাজ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। খুব কাছে থেকে দেখেছি কী দারুণ নিষ্ঠার সঙ্গে তারা কাজ করছে। প্রতিকূল পরিবেশে রাত-দিন খেটে তারা আমাদের স্বপ্নের সেতু গড়ে তুলেছে পরম মমতায়।

পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যানটি যুক্ত হওয়ার দিন সারা দেশের মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা লক্ষ করেছি তা সত্যি অনন্য। সবার একই প্রশ্ন। পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর কী কী প্রভাব পড়বে? তাই সংক্ষেপে এ নিয়ে কিছু বলতে চাই। দক্ষিণ বাংলার অর্থনীতিতে পড়বে ব্যাপক প্রভাব। দীর্ঘদিন পর সড়ক ও রেল—দুই পথেই দক্ষিণ বাংলার মানুষ অল্প সময়ে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারবে। এর ফলে এই প্রথমবারের মতো পুরো দেশ একটি সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোতে চলে আসবে। দক্ষিণ বাংলার গ্রামেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগবে। এই অঞ্চলের ২১টি জেলার কৃষক, মৎস্যজীবী, তাঁতি, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভোক্তার সমাবেশ যে রাজধানী ঢাকা তার সঙ্গে অনায়াসে সংযুক্ত হতে পারবে। অন্যদিকে তারা রাজধানী থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে পারবে তাদের গ্রামের ও আশপাশের এসএমই উদ্যোগগুলোর জন্য। এরই মধ্যে পদ্মা সেতু হবে শুনেই ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হতে শুরু করেছে। আস্থার এই ধারা আরো বেগবান হবে।

Print Friendly, PDF & Email