রোহিঙ্গাদের ফেরাতে ‘নতুন পথ’ খুঁজছে বাংলাদেশ - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে ‘নতুন পথ’ খুঁজছে বাংলাদেশ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা : সেনা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রাণে বাঁচতে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফেরাতে নতুন পথ খুঁজছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগের দুইবারের ব্যর্থতা ভুলে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে বাংলাদেশ এবার মিয়ানমারের বন্ধু দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা বাড়াতে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দাতা সম্মেলন।

মহামারির মধ্যে ভার্চুয়ালি হতে যাওয়া এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে একসঙ্গে ১০ বছরের মানবিক সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে। কিন্তু ঢাকা এই প্রস্তাবে রাজি হবে কি-না সেবিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। ঢাকার ভাষ্য, দাতাদের এই প্রস্তাবে রাজি হলে রোহিঙ্গা সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে গুরত্ব কমে যাবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গে জড়িত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দাতাদের সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন ইস্যুতেই জোর দেবে। এর বাইরে বাংলাদেশের চাওয়া থাকবে দাতারা যেন বার্ষিক হিসাবেই রোহিঙ্গাদের সহায়তা করে।

সবমিলিয়ে সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থান বাংলাদেশের জন্য দিনকে দিন বাড়তি একটি চাপে পরিণত হচ্ছে। এই চাপ নিয়ে সীমিত সম্পদের দেশটি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে উল্লখযোগ্য খরচ না হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হয়েছে। গত বছরে রোহিঙ্গাদের পেছনে যে অর্থ খরচ হয়েছে তার একটা অংশ কিন্তু বাংলাদেশকে বহন করতে হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়।

চলতি বছরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় ৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার সহায়তা চায় জাতিসংঘ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে এই সংকট মোকাবেলায় বড় একটি ঘাটতি রয়ে গেছে। এখন পযন্ত পাওয়া মোট অনুদান প্রয়োজনীয় অর্থের অর্ধেকেরও কম।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর আয়োজনে যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার পাশাপাশি এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও সম্মেলনে রাখা হচ্ছে না- মিয়ানমার, চীন ও ভারতের কোনো প্রতিনিধিকে।

দাতা সম্মেলনে ঢাকার অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে প্রত্যাবসন। মানবিক সহায়তা সাময়িক উপকারে লাগলেও এটা দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারে না। সুতরাং আমাদের মূল ফোকাস থাকবে প্রত্যাবাসন। তারা যেখান থেকে এসেছে সেখানেই ফেরত যাবে।’

সম্প্রতি দাতা সম্মেলন নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ কোনোভাবেই মাল্টি-ইয়ার প্ল্যানিংয়ে যেতে রাজি নয়। বাংলাদেশের প্রচেষ্টা থাকবে যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ উভয়সংকটে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে দাতাদের দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনায় রাজি না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। তবে শেষ পযন্ত দাতাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার লক্ষণও দেখছেন তারা।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হচ্ছেই না বরং তাদের পেছনে যে অর্থ খরচ হচ্ছে তার একটা অংশ কিন্তু বাংলাদেশকেও বহন করতে হচ্ছে। আমি যা দেখতে পাচ্ছি গত বছরে অর্ধেকের মত পয়সা বাংলাদেশ বহন করেছে। আমরাতো এমনিতেই সমস্যায় আছি তারমধ্যে কেন তাদের পয়সাটুকু খরচ করতে হবে, এইটুকুতো আন্তর্জাকিত সম্প্রদায় করতে পারত।’

সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘আমরা আশা করব, এবারের সম্মেলনে যে ব্যয় তাদের পেছনে নির্বাহ করতে হচ্ছে সেটা যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহন করে। তাহলে অন্তত আমাদের জন্য খানিকটা সহনীয় হবে। আমরা অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি কিছু চাই না কিন্তু লক্ষণ মনে হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী হবে। আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে কিভাবে রোহিঙ্গাদের পাঠানো যায়।’

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানাচ্ছে, সম্মেলনের আয়োজনকারীরা রোহিঙ্গা শরণার্থী, কক্সবাজারের স্থানীয় বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আরও অনুদানের আহ্বান জানাবে।

সংস্থাটি বলছে, চলতি বছরে এই সংকট মোকাবেলায় বড় একটি ঘাটতি রয়ে গেছে। এ বছরে পাওয়া মোট অনুদান প্রয়োজনীয় অর্থের অর্ধেকেরও কম। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় এ মাসে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএনএইচসিআর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে আলোচনায় বসছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা কোনো লংটার্মে দাতা সংস্থার সঙ্গে বসা বা এ নিয়ে আলোচনার পক্ষে থাকব না। আমরা দশ বছর পাঁচ বছর ওভাবেতো যাবই না, সেটার প্রশ্নই উঠছে না। পাঁচ দশ বছরের চিন্তাভাবনা করে এ সময়ে কত লাগতে পারে এ ধরণের চুক্তিতে বাংলাদেশের যাওয়া উচিত না। আমি মনে করি না, সরকার এ ধরণের পদক্ষেপে যাবে। কারণ ওটা বিপদজনক হবে। প্রতি বছরে যতটুকু দরকার সেটাই চাওয়া উচিত। তবে দাতাদের বলতে হবে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে।’

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সাহায্য প্রক্রিয়া সফল হলে ইউএনএইচসিআর লাভবান হবে জানিয়ে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদী সাহায্যের বিষয়টা ইউএনএইচসিআর করছে তাদের নিজেদের স্বার্থের কারণে। মনে রাখতে হবে এই যে ফান্ড রেইজ করা হয় সেখান থেকে ইউএনএইচসিআরের খরচাদি সেখান থেকে বহন করা হয়। আমরা সেই রাজনীতি বা পলিটিক্যাল ইকোনোমির মধ্যে যাব না। মিয়ানমার এভাবে বছরের পর বছর পার পেয়ে যাবে এটাতো হয় না। দাতা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও মিয়ানমারে ব্যবসা করে যাচ্ছে, সেটা আগে বন্ধ করতে হবে।’

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার মিলিটারির নির্যাতনের শিকার হয়ে সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আগে থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে এই সংখ্যা অন্তত ১০ লাখের মতো বলে ধারনা করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email