গণমানুষের নন্দিত নেত্রী - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

গণমানুষের নন্দিত নেত্রী

তোফায়েল আহমেদ
বাংলার গণমানুষের নন্দিত নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম শুভ জন্মদিন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ দেশ-বিদেশের মানুষ করোনা মহামারির মধ্যেই তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া ও আশীর্বাদ করছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কোল আলো করে ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার ছায়াসুনিবিড় টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণের সুবাদে শৈশব থেকেই সংগ্রামী চেতনার সুমহান উত্তরাধিকার বহন করছেন। পিতার সংগ্রামী জীবনের আত্মত্যাগ কাছ থেকে দেখেছেন, শিখেছেন। ছাত্রলীগের নেত্রী শেখ হাসিনা ইডেন মহিলা কলেজের নির্বাচিত ভিপি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনে সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগকে দীর্ঘ ৩৯ বছর নিষ্ঠা, সততা ও সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে, অত্যাচার-অবিচার, জেল-জুলুম সহ্য করে গণরায়ে অভিষিক্ত হয়ে চারবার সরকারে অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আগরতলা মামলায় জাতির জনক কারারুদ্ধ থাকাবস্থায় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যক্তিগত জীবনে আইটি বিশেষজ্ঞ পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও অটিজম বিশেষজ্ঞ কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের গর্বিত জননী তিনি।

১৯৭৫-এর মর্মন্তুদ ঘটনার পর আওয়ামী লীগ যখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল, তখন তিনি দলের হাল ধরেন। সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা তখন সামরিক শাসকের দুঃশাসনে নিপতিত। স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে তিনি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৮১ সালের সম্মেলনে সবাই ধরে নিয়েছিল, আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে যাবে। আমরা জীবনপণ চেষ্টা করে সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দলের ঐক্য ধরে রেখে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর দলের নেতৃত্বভার অর্পণ করে তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছিলাম আওয়ামী লীগের রক্তে ভেজা সংগ্রামী পতাকা। ১৯৮১ সালের ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে অনেক আলাপ-আলোচনার পর জাতীয় ও দলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। যেদিন তিনি প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন সেদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেছিলেন শেখ হাসিনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকেই ফিরে পেয়েছেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে নির্বাসন শেষে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন। যেদিন প্রিয় নেত্রী স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন সেদিন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, ছিল সর্বব্যাপী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি স্বেচ্ছায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেননি। দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের বৃহত্তর ও মহত্তর প্রয়োজনে তাঁর আগমন এবং নেতৃত্ব গ্রহণ। নেতৃত্ব গ্রহণের পর তাঁকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই তিনি রাজনীতি করছেন। কোনো পদ বা ক্ষমতা নয়, বরং পিতার মতোই বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতেই দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তাবে শহীদের রক্তে ভেজা দলীয় ও জাতীয় পতাকা স্বহস্তে তুলে নিয়েছেন। প্রমাণিত হয়েছে, সেদিনের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত আমাদের সিদ্ধান্তটি ছিল ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। নবপ্রজন্মের অনেকেরই জানা নেই কত আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। ১০৭৫-এর পর কঠিন সময় অতিক্রম করেছি আমরা। স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়ার নানা রকম ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও সফলভাবে কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন করার মাধ্যমে কায়েমি স্বার্থবাদী চক্রের একটি ঘৃণিত চক্রান্ত আমরা ব্যর্থ করতে পেরেছিলাম। কাউন্সিল অধিবেশনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে শেখ হাসিনা একটি বার্তা প্রেরণ করে বলেছিলেন, ‘আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এগিয়ে যান।’ বার্তাটি সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সম্মেলনে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। দলের শীর্ষ পদ গ্রহণে তাঁর সম্মতিসূচক মনোভাব সম্পর্কে কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বলেছিলাম, ‘আমরা সবাই একটি সুসংবাদের অপেক্ষায় আছি।’ শেখ হাসিনা তারবার্তায় সব ধরনের দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে ‘আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির’ মাধ্যমে কাউন্সিলর ও নেতাদের বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি সোনার বাংলা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে গণবিরোধী স্বৈরশাসকের ভিত কেঁপে উঠেছিল। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার আগে স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়ার নির্দেশে ‘শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে এ ব্যাপারে সতর্ক ও সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছিলাম আমরা।
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর সামরিক শাসনবিরোধী গণ-আন্দোলন সংগঠিত করেন। তত্কালীন সামরিক শাসকের নির্দেশে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকেসহ আমাদের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে সামরিক গোয়েন্দারা চোখ বেঁধে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। তাঁকে বিনা কারণে একটানা ১৫ দিন গৃহবন্দি আর আমাদের বিভিন্ন কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আমাকে সিলেট কারাগারে পাঠানো হয় এবং বিনা বিচারে তিন মাস আটক রাখা হয়। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বরে তাঁকে আবার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫ সালের মার্চে তাঁকে তিন মাস গৃহবন্দি এবং আমাকে ছয় মাস কুমিল্লা কারাগারে বিনা বিচারে আটক রাখা হয়। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা থাকা সত্ত্বেও ১৯৮৬-এর ১০ নভেম্বর তিনি যখন সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন পুলিশ তাঁর প্রতি গুলিবর্ষণ করে এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গাড়িতে উপবিষ্ট থাকা অবস্থায় তাঁর গাড়ি ক্রেন দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং পরদিন ১১ নভেম্বর তাঁকে এক মাসের আটকাদেশ দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর গাড়িবহরে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। অল্পের জন্য তিনি প্রাণে বেঁচে যান। সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রক্ষায় প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী প্রাণ বিসর্জন দেন। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচার কর্তৃক জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। কিন্তু প্রবল গণরোষের ভয়ে সামরিক সরকার ওই দিনই তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯৪-এ তাঁর আহ্বানে ট্রেন মার্চের সময় ঈশ্বরদী রেলস্টেশনের উত্তর প্রান্তে বন্দুকধারীরা তাঁর কামরা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। সেদিনও তিনি সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পর ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের ১৪-১৫ মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি থামব না, এসব ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করতেই হবে। আমি নিজের জীবনের জন্য ভীত হয়ে পড়লে গোটা জাতি ভীত হয়ে পড়বে। আমি জানি কিছু বুলেট আমায় তাড়া করছে।’ সত্যিই ঘাতকের চোখ শেখ হাসিনার ওপর থেকে সরে যায়নি। ঘাতকের সর্বশেষ নিষ্ঠুর আঘাত এসেছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে। সেদিন প্রিয় নেত্রী প্রাণে বেঁচে গেলেও জীবন দিতে হয়েছে আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মীকে। ১/১১-র পর তত্কালীন সেনাসমর্থিত সরকার তাঁকে আটক করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সর্বমোট ১৯ বার হামলা হয়েছে। অকুতোভয় শেখ হাসিনার বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতোই অসীম সাহসী, চিত্ত তাঁর ভয়শূন্য!

Print Friendly, PDF & Email