সিলটে কমিটি নিয়ে বিভক্ত আ.লীগ, কেন্দ্রে পাল্টা কমিটি - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

সিলটে কমিটি নিয়ে বিভক্ত আ.লীগ, কেন্দ্রে পাল্টা কমিটি

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সিলেট : সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের গোপনে করা পূর্ণাঙ্গ কমিটি আর গোপন থাকেনি।দীর্ঘ ৯মাস পর কেন্দ্রে জমা দেওয়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে শুরু হয়েছে ক্ষোভ-অসন্তোষ, বিদ্রোহ।দলের ত্যাগী ও দুর্দিনের পরীক্ষিত বিগত কমিটির দুই ডজনেরও বেশি নেতার জায়গা হয়নি প্রস্তাবিত জেলা ও মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে। আগের কমিটির যাদেরকে রাখা হয়েছে-তাদেরও যথাযত মূল্যায়নতো হয়নি উল্টো তারা অবমূল্যায়িত হয়েছেন প্রস্তাবিত কমিটি দু’টিতে।এসব কারণে সংক্ষুব্ধ নেতারা লিখিতভাবে কেন্দ্রের কাছে নালিশ জানিয়েছেন।বিকল্প কমিটিও কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়েছে।এসব তথ্য জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা।

তাদের মতে- পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও বিতর্কের উর্ধ্বে থাকা নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের পরিবর্তে জেলা ও মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত চার নেতা তাদের নিজ নিজ বলয়ের লোকজনকে ঠাঁই দিয়েছেন।এক্ষেত্রে কাচি চালানো হয়েছে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কাণ্ডারি ও কেন্দ্রীয় সদস্য প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ অনুসারী নেতাদের ওপর।নতুন কমিটি দু’টিতে এই দুই নেতার অনুসারী কয়েকজনের স্থান হলেও বাদ পড়েছেন অসংখ্য।বিগত কমিটিতে যাদের শক্ত অবস্থান ছিল, দলীয় কর্মসূচিতেও ছিল সক্রিয় অংশ গ্রহণ।

তবে ‘চমকের’ কমিটিতে জায়গা হয়েছে রাজাকার সন্তান, বালু-পাথরখেকোসহ বিতর্কিত অনেকেরই।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত সোমবার কেন্দ্র জমা দেয়া মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান হয়নি বিগত কমিটির সভাপতিমন্ডলী ও সম্পাদকমন্ডলীর ৯জনসহ অন্তত ১৫জনের।এদের মধ্যে বিগত কমিটির সিনিয়র সহ সভাপতি সিরাজ বকস, সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট তুহিন কুমার দাস, সহ সভাপতি মোশাররফ হোসেন, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কিশোর কুমার কর, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তপনমিত্র, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জগদীশ দাস, দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক দিবাকর কুমার ধর, সাংস্কৃতি সম্পাদক প্রিন্স সদরুজ্জামান, সাবেক সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের স্ত্রী আসমা কামরান, সাবেক সদস্য জামাল আহমদ চৌধুরী, ও ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলামও রয়েছেন।

এছাড়া প্রস্তাবিত কমিটিতে সহ সভাপতি রাখা হয়েছে আগের কমিটির সাধারণ আসাদ উদ্দিন, আগের কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ফয়জুল আনোয়ার আলাওর ও বিজিত চৌধুরীকে।যুগ্ম সম্পাদক পদ পেয়েছেন আগের কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এটিএম হাসান জেবুল, আগের কমিটির প্রচার সম্পাদক আবদুর রহমান জামিল এবং আগের কমিটির সদস্য ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজম খানকে। আগের কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ ও আগের কমিটির সদস্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ সেলিমকে রাখা হয়েছে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে।

আর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে আগের কমিটির ৩নং সহ সভাপতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ, সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ময়নুল ইসলাম,সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ মকলু মিয়া, সাবেক সদস্য আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের ভাই অধ্যক্ষ শামসুল ইসলামসহ আগের কমিটির ১০/১২জন নেতার স্থান হয়নি বলে জানা গেছে।

তবে, জেলার প্রস্তাবিত কমিটিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও সাবে সহ সভাপতি সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। যুগ্ম সম্পাদক পদে প্রস্তাব করা হয়েছে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ূন ইসলাম কামাল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আলী দুলাল ও সাবেক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক কবির উদ্দিন আহমদের নাম।সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছে সাবেক প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজ, সাবেক দফতর সম্পাদক সাইফুল আলম রুহেল ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডভোকেট রঞ্জিত সরকারের নাম।

প্রচার সম্পাদক পদে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট আব্বাস উদ্দিনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।এছাড়া সম্পাদকীয় পদে রাখা হয়েছে অ্যাডভোকেট আজমল আলী, মোস্তাক আহমদ পলাশ, মজির উদ্দিন, মতিউর রহমান মতিকে।

গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হয় সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি। এতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক হন অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান। আর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক হন অধ্যাপক জাকির হোসেন।

এর পর দীর্ঘ ৯মাস ধরে গোপনে দুই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করেন জেলা ও মহানগরের চার খলিফা।এর পর কেন্দ্রের বেধে দেয়া সময়ের মধ্যেই সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত পৃথক পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেয়া ।এদিন রাতে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার কাছে ৭৫ সদস্যের জেলা কমিটির তালিকা জমা দেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধরিণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান এবং মহানগর কমিটি জমা দেন মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন।

প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেয়ার পরই সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বিগত কমিটিতে থাকা এমন কয়েকজন নেতা এবারের কমিটিতে আশানরুপ পদ পাচ্ছেন না কিংবা বাদ পড়ছেন এমন সন্দেহে একত্র হন তারা। সিদ্ধান্ত নেন বিকল্প আরেকটি কমিটি কেন্দ্রে জমা দেয়ার।

এমন সিদ্ধান্ত থেকে বুধবার সন্ধ্যায় দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে তারা বিকল্প একটি কমিটি জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ফয়জুল আনোয়ার আলাওর জানিয়েছেন, যে কমিটি প্রস্তাব করা হয়েছে সেখানেই অনেকেই অবমূল্যায়িত হয়েছেন। এ কারণে সংক্ষুব্ধ হয়েছেন অনেকেই। অনেকেই এখন কেন্দ্রের কাছে তাদের মতামত জানাচ্ছেন।

তিনি জানান, বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের পদবঞ্চিত ও কাঙ্খিত পদ না পাওয়া নেতারা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে দেখা করেন। ওবায়দুল কাদের তাদের সকল অভিযোগ লিখিত আকারে দলীয় কার্যালয়ে জমা দিতে বলেন। পরে তারা দলীয় কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার কাছে তাদের লিখিত অভিযোগ এবং বিকল্প একটি কমিটির তালিকা জমা দেন।

বিকল্প এই কমিটিতে প্রথম সহ সভাপতি হিসেবে রাখা হয়েছে মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল আনোয়ার আলোয়ারকে এবং প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাখা হয়েছে সাবেক বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জগদীশ দাসকে।

Print Friendly, PDF & Email