শ্রমের হাটে 'পণ্য' মানুষ - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

শ্রমের হাটে ‘পণ্য’ মানুষ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা : প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সব শাসন ব্যবস্থাতেই দাস প্রথা ছিল। তখন গবাদিপশুর মতো মানুষও কেনাবেচা হতো। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের এই বাংলায়ও দাস প্রথা প্রচলিত ছিল। এমনকি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও এই প্রথা স্বীকৃত ছিল। তখনকার সময়ে বনেদি সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো ও গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে এ প্রথা সরাসরি যুক্ত ছিল। বাজারে মুক্ত শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর থাকার কারণে সমাজের বিত্ত ও শক্তিশালী একটি শ্রেণি তুলনামূলকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির লোকদের দাসে রূপান্তর করতো।

সময় বদলেছে। পৃথিবীর চাকায় গতিও বেড়েছে। কিন্তু এখনও টিকে আছে হাজার হাজার বছরের পুরোনো সেই দাস প্রথা। এখনও দেশের অনেক জায়গায় হাট বাজারে পণ্যের মত দর কষাকষি করে কেনাবেচা হচ্ছে মানুষের শ্রম। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজধানীতে অভাবি মানুষ দলে দলে শ্রম বিক্রির জন্য আসেন। তাদের কেউ নদীভাঙনের শিকার হয়ে। কারও আবাদি জমি নেই। কেউবা এসেছেন একটু উন্নত জীবনের আশায়। তারা সবাই ভোর না হতেই কাজের আশায় জড়ো হয়েছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মোড়ে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মোড়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাক ডাকা ভোর থেকেই কোদাল, খুন্তি, বিরা, ডালাসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে আছেন অনেক শ্রমিক। চোখে মুখে একরাশ শূন্যতা। এই বুঝি ডাক পড়বে, হয়তো আজকের মত প্রিয়জনের মুখে দু’মুঠো অন্নের ব্যবস্থা হবে।

এই হাট থেকে অনেকেই এই শ্রমিকদের দিন, সপ্তাহ, মাসিক হিসাবে কিনে নিয়ে যান কাজ করানোর জন্য। এসব শ্রমিকরা যেন এখনও বেচাকেনা হচ্ছে দাস সমাজের পণ্যের মত। এভাবে রাজধানীতে এখনো দাস প্রথা চালু আছে। তবে তা আধুনিক মোড়কে। কিন্তু সারাদিনের জন্য কাজ করে কত পান তারা? সেটা কি শ্রমের তুলনায় যথেষ্ট? আর কাজ না পেলে কি করেন তারা? কেনই বা এই পেশা বেছে নিয়েছেন? এমন নানা বিষয়ে জানতে কথা হয় বাজারে উঠা এসব শ্রমজীবীর সঙ্গে।

তারা জানান, করোনার কারণে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। তাই চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম কখনো কমে না। পেট তো সবারই চালাতে হয়। খুদা তো কোনও কিছু মানে না।

শ্রমিকের এই হাটে কিশোরগঞ্জ থেকে আসা ইব্রাহিম বলেন, ‘৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি নেই। তবে সপ্তাহে দুদিন থেকে ৩ দিন কাজ পাই। কোনও কোনও সপ্তাহে একদিনও কাজ পাই না।’

তি‌নি অভিযোগ ক‌রে ব‌লেন, ‘ক‌রোনার ম‌ধ্যে এক বেলা খাইছি, দুই বেলা না খে‌য়ে থাক‌ছি। এখন আল্লাহ কোনও কা‌মের ব‌্যবস্থা ক‌রে দি‌লে জীবনটা বাঁচ‌তো।’

ক‌রোনায় কোনও ত্রাণ পে‌য়ে‌ছেন কিনা- জান‌তে চাই‌লে তি‌নি ব‌লেন, ‘শু‌নে‌ছি সরকার না‌কি অনেক ত্রাণ দি‌য়ে‌ছে। কই আমরা তো পেলাম না। তাহ‌লে কা‌দের দি‌লো? যা‌দের ক্ষমতা আছে, টাকা-পয়সা আছে ত্রাণও তা‌দের‌ জন‌্য, আমা‌দের মত গ‌রিব‌দের জন‌্য না।’

ওই হাটেই গালে হাত দিয়ে বসেছিলেন মফিদুল ইসলাম। এভাবে বসে আছেন কেন? জানতে চাইলে মফিদুল নৈরাশ্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, ‘বেলা তো কম হলো না। গৃহকর্তারা ৭টার মধ্যে এসে নিয়ে যায়। এখন প্রায় ৮টা বাজে। কোনও কাজ পেলাম না। আজ হয়তো আর কাজ পাবো না। এ সপ্তাহে একদিনও কাজ পাইনি। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।’

৬০ বছর বয়সী আলী মিয়াও ওই হাটেই শ্রম বিক্রি করতে আসা একুশ শতকের একজন দাস। তিনি বলেন, ‘আমরা বাবা বুইড়া মানুষ, আমাগো এখন কদর কম। ভারি কাম করতে পারি না, তাই বাড়িঘর পরিষ্কার করি। কিন্তু তাও পাই না।’

তিনি বলেন, ‘নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রায় এক বছর আগে ঢাকায় আসি। দুই ছেলে বিয়ে করে অন্য জায়গায় থাকে। তাদের সংসারে টানাটানি। তাই আমাগো কেউ খোঁজ রাখে না।’

ষাটোর্ধ্ব বয়স রফিকুল ইসলামের। গায়ের জোর দেখিয়ে অন্যরা কাজ পেলেও তার সে অবস্থা নেই। আগে গ্রামে কাজ করলেও এখন গ্রামের কেউ তাকে কাজে নেয় না। অক্ষমতার কারণে স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরাও তাকে ছেড়ে চলে গেছে। অসহায় দিনমজুর বয়সের কাছে হার‌তে নারাজ। তাই প্রতিদিন ভোরে শহরের বিভিন্ন স্থানে কাজের অপেক্ষায় বসে থাকে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বয়স বেশি হয়েছে, হেই লাইগা আমারে কেউ কামে নিতে চায় না। কি করমু, পেটে তো কিছু দিতে হয়। তাই কামের লাইগা বইসা আছি।’

সরকারের দেয়া বয়স্ক ভাতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘হুন‌ছি বুইরাদের টাহা দেয়। আর কত বয়স হলে এইডা পামু?’

Print Friendly, PDF & Email