জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত চায়না বেগম - Jamuna.News
ব্রেকিং নিউজ

জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত চায়না বেগম

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, টাঙ্গাইল : চায়না বেগম। বয়স চল্লিশের কোটা পার করেছে অনেক আগেই। সফলতা নেই তবুও পেছনের পুরো সময়টা কাটিয়েছেন বেঁচে থাকার সংগ্রামে। সময়ের বিবর্তনে নারীদের অবস্থার পরিবর্তন হলেও বদলায়নি চায়নাদের প্রেক্ষাপট। ভোর থেকে সন্ধ্যা অব্দি কেটে যায় তিনবেলা খাবার জোগাড়ে। টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের সামনে খোলা আকাশের নিচে চায়নার চায়ের দোকান। চায়ের চুমুকে প্রায়ই কথা হয় তার সঙ্গে। চায়নার লম্বা সময়টা একটি জীবনযুদ্ধের গল্প। ঘণ্টা বাজিয়ে প্রতিবছর নারী দিবস উদযাপন হলেও চায়নাদের মতো নারীদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে না। জীবনযুদ্ধে চায়না এখন অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

চায়ের দোকান চালাতে শহরের আকুরটাকুর পাড়ায় একটি এক-কক্ষের ভাড়া বাসা নিলেও চায়নার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সহদেবপুর ইউনিয়নের গোঁপিনাথপুর গ্রামে। চায়নার বাবা সামাদ ফকিরের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অল্প বয়সেই মধপুরের শাহজাহানের সাথে চায়নাকে বিয়ে দেয়। বিয়ের দুই বছরের মাথায় চায়নার কোলে এক মেয়ে সন্তান দিয়ে চায়নার স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। মেয়ে ফাতেমাসহ পুরো সংসারের দায়িত্ব পড়ে স্বামীহারা চায়নার কাঁধে। শুরু হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন শহরে। সেই থেকে খোলা আকাশের নিচে চায়নার চায়ের দোকান। সকাল থেকে সন্ধ্যা টানা চায়ের দোকানে চায়না। প্রেসক্লাবে কোনো অনুষ্ঠান থাকলে কয়েক কাপ চা অনায়াসে বিক্রি করতে পারেন তিনি। অন্যথায় কেটলির পানি গরম করেই সময় কাটাতে হয়। সেই ২০০২ সাল থেকে কেটলি আর কাপের সাথে চায়নার সম্পর্ক। তবুও দিনের উপার্জনে রাতে চুলো জ্বালানো কষ্টকর। দোকানের সামনেই প্রায়ই ঘটে মিছিল-মিটিং আর মানববন্ধন। এই সময়টাতেও চায়নাকে ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কেটলির পাশে। অনেক সময় বিপাকেও পড়তে হয় চায়নাকে। তবে ফুটপথের এই চায়ের দোকানের উপার্জনই বড় করেছে চায়নার মেয়ে ফাতেমাকে।

ফাতেমা বড় হয়ে চায়নার পাশে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা থাকলেও হয়েছে তার উল্টো। চায়নাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে চায়নার বাবা যে ভুলটা করেছিল তেমন ভুলটাই করেছেন চায়না। চায়না তার মেয়ে ফাতেমাকেও অল্প বয়সেই সন্তোষের আল-আমিনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। দুই কন্যা সন্তান হওয়ার পর ফাতেমার প্রবাসী স্বামীও খোঁজ খবর নিচ্ছে না তার। ফলে ফাতেমার সাথে দুই নাতনির দায়িত্বও পড়েছে চায়নার কাঁধে।

জীবনযুদ্ধে টিকে থাকাটা আরও কঠিন হয়েছে। চায়ের দোকানের উপার্জনে সংসার যেন চলছেই না। ফলে চায়নার মেয়ে ফাতেমা চায়ের দোকানের পাশেই সাত্তার শপিংমল নামের একটি শো-রুমে সেলসম্যানের কাজ নিয়েছেন। এখন শিশু নাতনি দুটোকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চায়না। প্রায়ই দেখা যায় শিশু নাতনিকে কেটলির পাশেই টেবিলে ঘুম পাড়িয়ে কাজ করছেন চায়না। ফাতেমা কাজ করছেন শো-রুমে। এমন চিত্র অনেকেরই বিবেকে নাড়া দেয়।

চায়না জানান, এভাবে জীবন সংগ্রামে কেটেছে তার ১৮ বছর। অনাহারে-অর্ধহারে কাটছে তার জীবন। খোলা আকাশের নিচে চায়নার চায়ের দোকান জীবনের জন্য যেন এক অনিশ্চয়তা। ঝড়-বৃষ্টিতে বন্ধ রাখতে হয় তার ছোট্ট দোকানটি। চায়ের চুলো না জ্বললে বাড়ির চুলো জ্বালানোও কঠিন হয়ে পড়ে তার। চায়নার প্রয়োজন একটি স্থায়ী দোকান। যেখানে উপার্জনের একটি পথ নিশ্চিত হবে। তার অল্প আয়ে ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন চায়না। এখন প্রায় দেড় লাখ টাকার কিস্তি টানতে হচ্ছে তাকে। এমন অবস্থায় বড়ই ক্লান্ত চায়না। জীবনের ক্লান্তির অবসান পেতে পথ খুঁজছেন তিনি। কবে তারা ভাগ্যের চাকা উল্টো দিকে ঘুরবে এমন প্রত্যাশায় চায়না চালিয়ে যাচ্ছে জীবন সংগ্রাম।

Print Friendly, PDF & Email