ব্রেকিং নিউজ

বায়ুতে বিষ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : খারাপ খবরটা অনেকদিন আগে থেকেই শোনা যাচ্ছে। এখন আবার আলোচিত হচ্ছে বিষয়টা। আমরা জানতে পেরেছি, ঢাকার বাতাসে শ্বাস নেওয়া কতটা বিপজ্জনক। গবেষণা বলছে, ঢাকায় বসবাসরত মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ বায়ুদূষণজনিত রোগে ভুগছে। এর মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ৮ শতাংশ। এছাড়া সরাসরি বায়ুদূষণজনিত কারণ নয়, কার্ডিয়াক সমস্যায় ভুগছে ৮ শতাংশ, আর ক্যানসার আক্রান্তের হার ১.৩ শতাংশ। বায়ুদূষণ পরোক্ষে এ দুটি রোগে আক্রান্ত হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
সরকারের বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এক জরিপে এই তথ্য দিয়েছে। বিআইডিএসের গবেষক মিতালী পারভীন তার মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে একজন মানুষ ২২ মাস আগে মারা যায়। বায়ুদূষণ না থাকলে ২২ মাস বেশি বাঁচতে পারতো ওই মানুষ। ঢাকায় ৯৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ৩১ ওয়ার্ডকে বাছাই করে বিআইডিএস। প্রতিটি ওয়ার্ডের ১০০টি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিশ্বের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার বায়ুতে দূষণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। রাস্তায় বের হলেই নাকে-মুখে ঢুকছে ধুলা। দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান এখন প্রথম দিকেই থাকছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি, কলকাতা ও ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তাও আছে সমানতালে। বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণে এসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস ও এয়ার ভিজ্যুয়াল গবেষণা জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের দূষণের সূচকে বিশ্বের তিন হাজার ৯৫টি শহরের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত ৩০টি শহরের ২২টি ভারতের, পাকিস্তানের দু’টি, চীনের পাঁচটি ও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা রয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, বায়ুদূষণ রোধে অনেক দিন থেকে কাজ হচ্ছে। ১৬টি সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র (ক্যামস) থেকে সার্বক্ষণিক বায়ুদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। বায়ুদূষণ বাড়ার কারণ নির্ণয়ে নতুন জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বায়ুর পাশাপাশি পরিবেশের সব ধরনের দূষণ কার্যক্রম সম্পর্কে জরিপ করা হবে। এর মাধ্যমে দূষণের একটা সমন্বিত ধারণা পাওয়া যাবে।

এই ধারণাটা জরুরি। ধারণা পরিষ্কার হলে নিশ্চয়ই দূষণ থেকে মুক্তির উপায়ও মিলবে। তবে আমাদের আমজনতারও কিছু ধারণা সৃষ্টি হয়েছে পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে। চারশ’ বছরের এই রাজধানী ঢাকা শহরের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল বিভিন্ন গাছ। পরিকল্পনা করেই পিচ রাস্তার ধারে লাগানো হয়েছিল অনেক গাছ। এখনও যেখানে যেখানে গাছ বেশি, যেমন বিশ্ববিদ্যালয় ও রমনা এলাকায় দূষণ কিছুটা কম। ঢাকা সেনানিবাস এলাকায় অনেক গাছ এবং সেখানে দূষণ সম্ভবত সবচেয়ে কম।

পরিকল্পিত শহরটি হঠাৎই যেন বড় হতে থাকে, নানা প্রান্তে সম্প্রসারিত হতে থাকে কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই। এখন জিরো পয়েন্ট থেকে নারায়ণগঞ্জ কিংবা গাজীপুর যাওয়ার পথে সেই অর্থে কোনও গাছ চোখে পড়ে না। গাছ কমায় শহরে বাড়ছে দূষণের পরিমাণও। দূষণের জেরে মানুষের দেহে নানা রোগ বাসা বাঁধছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাপক হারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ হচ্ছে সারাদেশের মতো এই নগরীতেও। আমাদের উন্নয়ন স্পৃহা, উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা একটা বড় জায়গায় বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে, একথা সত্যি এবং মানুষ উন্নয়ন চায়। তবে পরিবেশ দূষণে ঢাকা শহরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল নির্মাণকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কর্তৃপক্ষ, ২০তলা নির্মাণাধীন জাতীয় রাজস্ব ভবন নির্মাণ কর্তৃপক্ষ, ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর এবং দক্ষিণ, ঢাকা ওয়াসা, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, গণপূর্ত অধিদফতর, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল সম্প্রসারণ কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২৪তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্প, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্মাণাধীন ১৪তলা ভবন কর্তৃপক্ষ, ভূগর্ভস্থ ক্যাবল লাইন প্রকল্প, ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর) আগারগাঁও রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১৪তলা বিটিইবি ভবন-২ প্রকল্প, নির্মাণাধীন বিটিআরসি ভবন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নির্মাণাধীন ১৩তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্প বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া দূষণ হচ্ছে নানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত নির্মাণকাজ থেকেও। কিছু কিছু সড়ক ও এলাকা আছে, যেগুলোর বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত ধুলোর জেরে চলাচল করাই দায়। ধুলার কারণে শ্বাস নিতেও রীতিমতো কষ্ট হয়। স্কুলের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভুগছে বলে ধারণা করছি।

এসব প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদফতরের দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া উচিত। কাজগুলো যত দ্রুত শেষ হবে বায়ুদূষণ ততটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

সরকার ও সরকারি সংস্থা দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে, এটাই প্রত্যাশা। আইন অনেক হয়েছে, এগুলো প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০৭০ সালের মধ্যে দেশের কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাবে। তাই ইটভাটা ও আবাসন শিল্পে জমির ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। জনগণকেও সচেতন হতে হবে। বায়ুদূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষের মাঝে একটা উদ্বেগ তৈরি করতে হবে। চিকিৎসকদের বায়ুদূষণের প্রভাব সম্পর্কে সরকারকে ধারণা দিতে হবে।

তবে শুধু উদ্বেগ যথেষ্ট নয়। রোজ শ্বাসবায়ুর সঙ্গে বিষ নিচ্ছি আমরা শরীরে। সে কথা মাথায় রেখে যত দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, ততই এ শহরের মঙ্গল। অত্যন্ত দ্রুত পরিস্থিতির মোকাবিলায় রাস্তাঘাটে নিয়মিত পানি ছিটানোর যে কাজ শুরু হয়েছে, তা চলমান রাখতে হবে। রাস্তার দুই ধারে এবং মাঝের অংশে সবুজ বাড়ানো, রাস্তার ভাঙা অংশ দ্রুত সারিয়ে ফেলার মাধ্যমে পথের ধুলা কমিয়ে আনা সম্ভব। শহরে এবং শহরকে ঘিরে যেসব নির্মাণ নিরন্তর হচ্ছে, সেইসব নির্মাণস্থলে খুব কঠোরভাবে বায়ুদূষণ সংক্রান্ত কিছু বিধি কার্যকর করা জরুরি। তাতেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করবে বলে আশা করছি।

(লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা।)

Print Friendly, PDF & Email