ব্রেকিং নিউজ

নতুর পেঁয়াজ আসলেই সমাধান

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা : পেঁয়াজ আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে পেঁয়াজের বাজার আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক এবং জরুরি ভিত্তিতে আকাশপথে পণ্যটি আমদানি করা হলেও বাজার আরও চড়া হচ্ছে। আরও ২০ দিন অর্থাৎ নতুন পেঁয়াজ আসার আগপর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলবে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে পেঁয়াজে কারসাজির অভিযোগে সরকার ৩৪১ জনের তালিকা তৈরি করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে ব্যবসায়ীদের তলব করেছে। গতকাল সোমবার ৪৭ আমদানিকারককে তলব করে চিঠি পাঠায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল ১৪ আমদানিকারক অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ করে, কারসাজির জন্য পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাই দায়ী।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, গত এক মাসে কয়েক দফা আমদানিকারক ও পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। সেসব বৈঠকে আমদানিকারক ও পাইকাররা পেঁয়াজ সংকটের জন্য একপক্ষ আরেকপক্ষকে দায়ী করে আসছে। গত রবিবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে বাণিজ্য ও খাদ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায়ও পেঁয়াজ সংকট সমাধানের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ওই বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যানও উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ভোক্তা সমিতির (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান প্রায় তিন মাস ধরে পেঁয়াজ সংকটের সমাধান না হওয়ার জন্য সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন।

তিনি বলেন, নতুন পেঁয়াজই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণের বড় ভরসা। প্রতি বছর নতুন পেঁয়াজ আসার দুই মাস আগ থেকেই পেঁয়াজের সংকট দেখা দেয়। তবে এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন কম হয়।

তিনি বলেন, সংকট সমাধানে সরকার অতিমাত্রায় ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় পেঁয়াজের লাগামহীন দাম বেড়েছে। এ বছরে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী বছরগুলোতে যেন এরকম পরিস্থিতি না হয় সেই পরিকল্পনা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম বলেন, আমদানিকারকরা কার কাছে, কী পরিমাণ এবং কী দামে বিক্রি করেছে এবং তাদের কাছে কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তা জানার জন্যই ডাকা হয়েছে। আমরা মনে করছি, বাজারে এখনো পর্যাপ্ত পেঁয়াজ রয়েছে। এ পেঁয়াজ কোন ধাপে মজুদ রয়েছে, তা জানতে চাই। ভীতি ছড়াতে নয়, পেঁয়াজে বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

রাজধানীতে পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় পাইকারি আড়ত শ্যামবাজারে গতকাল পণ্যটির সরবরাহ অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক কম ছিল। তবে বেশিরভাগ আড়তেই দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ ছিল না। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতি বছর এ সময়ে শ্যামবাজারে ৭০০-১০০০ টন পেঁয়াজ এলেও গতকাল এসেছে ১২০-১৩০ টন। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ এর আশপাশের খুচরা বাজারে। গতকাল ওইসব খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হয়েছে ২০০-২২০ ও মিয়ানমারের সর্বোচ্চ ১৯০ টাকা। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায়ও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধিরা।

আমাদের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নগরীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে মিয়ানমারের পেঁয়াজের কেজি ২২০ ও মিসরের পেঁয়াজ ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এছাড়া নগরীর পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে মিয়ানমারের ১৫০-১৮০, মিসর ১৪০-১৫০ ও চীনের ৯০-১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে পেঁয়াজের গড় চাহিদা দুই লাখ টন। তবে রমজান ও কোরবানির সময়ে চাহিদা অনেক বেশি থাকে। আর অক্টোবর-ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর দাম বেশি থাকায় চাহিদা কমে দেড় লাখ টনে দাঁড়ায়।

ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধির পর পেঁয়াজের চাহিদা কমে যায়। অনেকে খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে দৈনিক গড় চাহিদা দুই হাজার টনের কিছু বেশি। কিন্তু বাজারে এর থেকে কম সরবরাহ হওয়ায় দাম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এ সমস্যা আগামী ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে।

এ বিষয়ে শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহ-সভাপতি আবদুল মাজেদ বলেন, ‘বাজারে যদি পণ্য না থাকে তাহলে দাম তো বাড়বেই। দেশে পেঁয়াজ নেই, মিয়ানমারেও পেঁয়াজের সংকট। আকাশপথে যে পেঁয়াজ আসছে সেগুলো টিসিবি বিক্রি করছে। রবিবার আমরা মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, আগামী মাসের শুরুতে সমুদ্রপথে বড় তিন কোম্পানির পেঁয়াজ বাজারে আসবে। এগুলো এলে হয়তো দাম কিছুটা কমবে। আর এর পরপরই দেশি নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করবে। তখন দাম একেবারেই নিয়ন্ত্রণে আসবে।

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দুষলেন আমদানিকারকরা

পেঁয়াজের দর বৃদ্ধির পেছনে আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে মজুদ করে রাখার অভিযোগ তোলা হলেও তারা তা অস্বীকার করেছেন। বরং হঠাৎ দর বৃদ্ধির জন্য আমদানি স্বল্পতা এবং খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়েছেন তারা। গতকাল রাজধানীর কাকরাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা এসব কথা বলেছেন।

আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, তাদের কাছে পেঁয়াজের কোনো মজুদ নেই। তবে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যবসায়ীদের কাছে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ রয়ে গেছে। এ মজুদ কোন শ্রেণির ব্যবসায়ীর কাছে রয়েছে, সে বিষয়ে ধারণা নিতে আমদানিকারকদের ডাকা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট বাজারের আরএম এগ্রোর মালিক মো. মেজবা বলেন, শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তা জানতে চেয়েছেন কোনো পেঁয়াজ মজুদ আছে কি না। অন্য কেউ মজুদ করেছে কি না। কী পরিমাণ পেঁয়াজ কত দরে আমদানি করেছি, কত দরে বিক্রি করেছি। বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কম কেন?

তিনি বলেন, ভারত ২৯ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর আমরা কোনো পেঁয়াজ আমদানি করিনি। আর তার আগে আমদানি করা পেঁয়াজও মজুদ করিনি। কারণ ভারতীয় পেঁয়াজ দেশে আসতে ট্রাকে ত্রিপলের নিচে থাকে কয়েক দিন। তাতে বাংলাদেশে আসার আগেই পেঁয়াজের ওপরের অংশ কালো হয়ে যায়, অর্থাৎ পচন ভাব দেখা দেয়। তাই ভারতীয় পেঁয়াজ মজুদ করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা তলব করায় কোনো ভয় পাইনি। তবে সাত-আট বছরের ব্যবসাজীবনে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। জীবনে এই প্রথম প্রশ্নের মুখে পড়লাম। এতে এক ধরনের ‘নার্ভাসনেস’ কাজ করেছে।

মজুদদারি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আমদানিকারকদের ডাকা হয়েছে এ বিষয়ে সহিদুল ইসলামের বক্তব্য, ‘বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ তো আসতেই পারে বা আসে। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অবকাশ থাকে না। আমরা চলমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটা বলেছি, কিন্তু কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

শ্যামবাজারের আবদুল মাজেদ বলেন, ‘কেউ কারসাজি করলে অবশ্যই তার শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যাতে নিরীহ ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার না হয়। তাহলে আগামী মৌসুমে আর কেউ পেঁয়াজ আমদানি করতে চাইবে না। তখন অবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।’

Print Friendly, PDF & Email