ব্রেকিং নিউজ

শিক্ষক পেটানোর বিপ্লব

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার : ‘গোবেচারা শিক্ষকরা’ নিজেদের সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি মনে করে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন। অবশ্যই উপযুক্ত সম্মানীবঞ্চিত ও সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত এ সম্প্রদায়ের ওই আত্মতৃপ্তি বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। তাই মাঝে মাঝে তাদের ওই সম্মানে একটু আঘাত লাগলেই তারা প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠেন। অনেকে অনুযোগ করেন—প্রায়ই এই সময়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা তাদের যথাযথ সম্মান প্রদান করছেন না। পূর্ববর্তী সময়ে শিক্ষকদের সম্মান ঈর্ষণীয় পর্যায়ে ছিল বলেও তারা দাবি করেন। কেউ কেউ আবার সুযোগ পেলেই কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষা গুরুর মর্যাদা’ কবিতাটির দুই চার লাইন:
বাদশাহ কহেন, ‘সেদিন প্রভাতে
দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে

নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন

পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।

নিজ হাত খানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে

ধুয়ে দিল না কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।

উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষক তবে দাঁড়ায়ে সগৌরবে,

কুর্ণিশ করি বাদশাহর তরে কহেন উচ্চরবে-

‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষা গুরুর শির

সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।

প্রতিপক্ষকে শুনিয়ে দিয়ে মুঘল বাদশা আওরঙ্গজেব আলমগীরের ভূয়সী প্রশংসায় মেতে ওঠেন। আর আফসোস করে বলেন—আহ! সত্যি যদি বাদশাহ আলমগীরের শাসন আবার ফিরে আসতো, কত না ভালো হতো!

কিন্তু শিক্ষকরা ভুলে যান, পৃথিবীর সব শাসকই বাদশা আলমগীর নন। আর ইতিহাসের পাতায় পাতায় শাসকরা শিক্ষকদের সব সময় সম্মান করেছেন এমন ইতিহাস লেখা নেই। আরবি সাহিত্যে উল্লিখিত শিক্ষকরা ‘মোটা মাথার লোক’, ‘প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকরা সবচেয়ে মূর্খ লোক’ ইত্যাদিও লেখা আছে। আর এদেশে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের ‘তিন পাওয়ালা কুকুরদের’ জন্য মাসে ২৫ টাকা ব্যয় ও পণ্ডিত মশায়ের মাসিক ১৭ টাকা বেতনে ৮ সদস্যের পরিবারের জীবন ধারণের গল্প প্রায় সবার জানা।

স্বাধীন বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর আগে সংসদে দাঁড়িয়ে একজন সংসদ সদস্য একজন সম্মানিত শিক্ষক ও সাদা মনের মানুষকে নিয়ে বেশ তাচ্ছিল্য করে যা বলেছিলেন, তার সার সংক্ষেপ অনেকটা এই রকম: তিনি একজন শিক্ষক। তার এত টাকা কোথা থেকে আসে? গাড়ি বাড়ি কোথায় পান?

এই ধারণাটি শুধু ওই সম্মানিত সংসদ সদস্যের নয়; প্রায় পুরো সমাজ বা রাষ্ট্রযন্ত্র এমনটি বিশ্বাস করে বলে মনে হয়। আর এমন ধারণা হওয়ার কারণ আবহমান কালের চিরাচরিত ঐতিহ্য—‘প্রকৃত পণ্ডিত মশায় মানে ধবধবে সাদা পুরাতন পাঞ্জাবি গায়ে, ভাঙা ছাতা হাতে, মরচে ধরা হাতলওয়ালা সাইকেলে অথবা কখনও পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল গিয়ে ছাত্র পড়ানো ব্যক্তির ছবি’ আমাদের মানসপটে ফুটে ওঠে। আমরা ধরেই নেই যে, যিনি অধিক বিদ্বান, তিনি হবেন অতি ভদ্র, বিদ্যার ভারে তার মাথা সব সময় নুয়ে থাকবে।

প্রায়শই দেখা যায়, নকল ধরার অপরাধে অথবা বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে চাঁদা না পেয়ে ছাত্রনেতারা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করছেন। ডিজিটাল যুগের ছাত্রনেতারা অবশ্যই চড়-থাপ্পড়ে বিশ্বাসী নয়। তারা চায় তাদের কাজ ফেসবুকে ভাইরাল করতে। তাই বেশ কয়দিন আগে ছাত্রনেতাদের অনৈতিক দাবি না মানায় একজন শিক্ষককে পুকুরে ফেলে দিয়ে তারা ভাইরাল হয়েছে। এরপর হয়তো নদীতে, সমুদ্রে শিক্ষকদের ফেলে দেওয়া হবে।

অবশ্যই বর্তমানে অনেক শিক্ষকের নৈতিকতার মানের যে অবস্থা, তাতে তাদের হাজার বার জলে ধুলেও হয়তো পরিশুদ্ধ করা কঠিন হবে। গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী উপাচার্য খন্দকার নাসিরউদ্দিনের মতো শিক্ষকের এদেশের বিশ্বদ্যিালয়ে, স্কুলে, কলেজ অভাব নেই। তাই সমাজে শিক্ষকদের সম্মান কমে যাওয়ার দায় অন্যদের ওপর চাপানোর আগে শিক্ষকদের চিন্তা করা উচিত, তারা শিক্ষক হিসেবে কতজন শিক্ষককে প্রকৃতপক্ষে সম্মান করতে পারবেন? তারা যদি তাদের একই পেশায় নিয়োজিত অন্যকে সম্মান না করতে পারেন, তাহলে অন্যরা কেন খালি খালি তাদের সম্মান করতে যাবে। বেশ কিছু দিন আগে আমি নিজেই আমার শিক্ষক ও আমার চারপাশের শিক্ষক সমাজের মধ্যে কোনও কোনও শিক্ষককে দেখলে আমার মাথা নুয়ে আসে সেটা নিয়ে ভাবছিলাম। নীতি-নৈতিকতা বিদ্যানে, জ্ঞান-গরিমায় আচরণে সম্মান করা যায়, এমন শিক্ষকের লিস্ট খুব বড় হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

অন্যদিকে আজকে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের প্রতিপক্ষ শিক্ষকরা। তিনি যতবড়ই ছাত্রনেতা হোন, শিক্ষকের মদত ছাড়া তার পক্ষে অন্য শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান শিক্ষাঙ্গনের চলমান সংকটের জন্য শিক্ষকরাই মূলত দায়ী। তারা একপক্ষ অন্যপক্ষের সম্মান নিয়ে কানামাছি খেলতে পছন্দ করে বলেই ছাত্ররা সেই সুযোগে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার সাহস পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের কারণে টিকে থাকার জন্য তাদের ছাত্রনেতাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজেকে রক্ষা আর প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য একদল ছাত্রকে পুষতে হয়। শিক্ষকদের উপাচার্য হওয়ার বাসনা অথবা অন্য লাভজনক পদগুলোয় যাওয়ার মন কামনাই এর জন্য কম দায়ী নয়। উপাচার্য হওয়ার জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ছাত্রনেতাদের কাছে ধরণা দিতে দেখা যায়। এমন যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের অবস্থা তাহলে ছাত্রনেতার হাতে লাঞ্ছিত হওয়া অস্বভাবিক নয়।

যদিও জাতির প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হবেন বুদ্ধিজীবী। তারা যেকোনও সংকটে জাতিকে দিক-নির্দেশনা দেবেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক দলকানা। লাল-হলুদ-গোলাপি-নীল-সাদায় বিভক্ত। অনেকে আবার নিজেকে বুদ্ধিজীবী দাবি করলেও অধিকাংশ সময়ে তারা সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে কাজ করেন। অবশ্য সত্যকে সত্য বলার সৎ সাহস অথবা সবার সেই মেরুদণ্ড থাকবে, এমন কোনও কথা নেই। কিন্তু অবাক হই, যখন দেখি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অসত্য কথা বলেন। অন্যায়কে আয়ের উৎস মনে করে মিথ্যার বেসাতি করেন। এক-দুই জন হলেও তা না হয় কথা ছিল। দল বেঁধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অসত্য কথা বলেন, এমন উদাহরণ আছে ভুরি ভুরি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি—একটি ঘটনা পুরোদস্তুর অসত্য কিন্তু একদল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেটাকে সত্য বলছেন। শুধু সত্য বলছেন তা নয়, সেই অসত্যকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পুরোদস্তুর মিথ্যার পর মিথ্যা বলে যাচ্ছেন। ন্যূনতম কোনও অপরাধবোধ তাদের মধ্যে কাজ করছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নৈতিকার মানের যখন এই অবস্থা, সেখানে ন্যায় ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে ছাত্ররা শিক্ষক পেটালে উপাচার্য ওই পেটানোর ঘটনাকে বিপ্লব বা ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করবেন, এটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ উপাচার্য হলেও তিনি শিক্ষক। শিক্ষকতা হচ্ছে তার গোড়া। পচনটা সেখানেই ধরেছে। আমরা অযথা উপাচার্য পদকে দোষারোপ করি। তার শিক্ষক সত্তাকে ভুলে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করি। মনে রাখা দরকার, পচে যাওয়া শিক্ষক সমাজের মাঝ থেকেই তিনি উপাচার্য হয়েছেন। ফলে ব্যতিক্রম বাদে উপাচার্যদের কাছ থেকে খুব ভালো কিছু আশা করা অনর্থক। গাছের আগায় পানি দিয়ে লাভ নেই। পানি ঢালতে হবে গাছের গোড়ায়। মূল সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চিন্তায়-ভাবনায়-চেতনায়। সেই সমস্যা সমাধানের দিকে নজর দিতে হবে।

 

(লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।)

Print Friendly, PDF & Email