ব্রেকিং নিউজ

জাতীয় চার নেতা : সিদ্ধান্ত নিতে না পারা

স্বদেশ রায় : ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর এটি স্পষ্ট ছিল যে, আরও কিছু হত্যাকাণ্ড হবে। কারণ ৭৫-এর ১৫ আগস্টে প্রতিবিপ্লবীরা, বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিবসহ পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হত্যা করে। তারা হত্যা করে প্রতিভাবান তরুণ নেতা শেখ ফজলুল হক মণিকে। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর ভেতর দিয়ে তারা তাদের প্রতিবিপ্লবকে সফল করে। কিন্তু তারা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হয় না। কারণ তখনো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া নেতারা বেঁচে ছিলেন। তাই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের এই প্রতিবিপ্লবের দেশি-বিদেশি সব শক্তিই এটা বুঝেছিল প্রতিবিপ্লবকে নিষ্কণ্টক করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন এমন নেতাদেরও হত্যা করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করতে হবে সামরিক বাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত যে সদস্য রয়েছেন, তাদেরও। তাদের হত্যাকাণ্ডের ব্লু প্রিন্টটা ছিল বেশ দীর্ঘ ও নানামুখী। সেটা তারা বাস্তবায়নও করে। আর এখানে প্রথমেই যে হত্যাকাণ্ডের শিকার হবেন মুজিবনগর সরকারের শীর্ষ নেতারা, তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিককর্মী; এই দুই পর্যায়েই মুজিবনগর সরকারের শীর্ষপর্যায়ের এই নেতাদের পরিবারের সদস্য, তাদের বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও দেশে-বিদেশে তারা বিভিন্ন সময়ে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, এই ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে নানাভাবে আলোচনার সুযোগ পেয়েছি। এই নানান আলোচনার খণ্ডচিত্র মেলালে এটি বেশ স্পষ্ট হয় যে, ১৫ আগস্টের সকালের পরেই এই শীর্ষ চার নেতাসহ আরও কিছু শীর্ষ নেতা বুঝতে পেরেছিলেন, তাদের আর বাঁচিয়ে রাখা হবে না। এটি বোঝার পরও তারা দ্রুত কেন অন্য কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, এই প্রশ্নের জবাব অনেকখানি মেলে না। তবে এটি নিশ্চিত যে, তারা কেউই কোনও অশুভ উদ্দেশ্য থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন না। তবে তাদের কাছে প্রত্যাশা ছিল, সাধারণ মানুষ কী করতে হবে, এটা যেন বুঝে উঠতে না পারেন, নেতা হিসেবে তাদের দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। এখানে তারা ব্যর্থ হন। ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য এটা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত পাওয়া। যদিও খুব দ্রুত মুজিবনগর সরকারের শীর্ষ চার নেতার বাড়ির টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের বাড়ি পুলিশ প্রটেকশনে নেওয়া হয়। কিন্তু এর আগে যে সামান্য সময়টুকু পাওয়া গিয়েছিল, এত বড় মাপের নেতাদের জন্য এই সময়টুকু কম ছিল না। এটা যে কম সময় ছিল না, তা যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পরোক্ষভাবে হলেও তার স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনের কাছে স্বীকার করে গেছেন। ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে জোহরা তাজউদ্দীন জেলখানায় দেখা করতে গেলে তাজউদ্দীন আহমদ তাকে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র রাজনৈতিক ভুল মুজিব ভাই নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে না যাওয়া।’ তাজউদ্দীন আহমদ ওই সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন না, তাই হয়তো তিনি তার ভুলটাকে চিহ্নিত করেছেন সঙ্গে সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না নিতে পারার। অন্য তিন নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান ক্ষমতায় ছিলেন। তাই তাদের সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত ছিল, সেটি ইতিহাসের গভীর পর্যালোচনা ছাড়া সম্ভব নয়। তারা তিনজন মৃত্যুর আগে তাদের সিদ্ধান্ত কী হতে পারতো, সেটি চিহ্নিত করেছিলেন কিনা, তা আজও জানতে পারিনি। কোনও গবেষক জেনেছেন এমন কোনও গবেষণাও পাইনি। তবে তাজউদ্দীন আহমদের মতো এই তিনজনও যে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, এটা ইতিহাসে সত্য। এই সিদ্ধান্ত নিতে না পারাটা ভবিষ্যতে তাদের নেতৃত্ব গুণাবলী নিয়ে হয়তো কিছু প্রশ্ন তুলবে। কারণ আবেগের বাইরে ইতিহাসের একটা অংশও থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়ে যাওয়ার পরে আবেগের থেকে বাস্তবতাটাই বড় হয়ে দেখা যায়। তাই ভবিষ্যত ইতিহাস এ প্রশ্ন তুলবেই। ইতিহাস যখন এ প্রশ্ন তুলবে, তখন বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের আনুগত্য ও সে জন্য জীবন দেওয়া বা তাদের রক্তধারা এ প্রশ্নকে কতখানি ঢেকে দিতে পারবে, সেটিও ভবিষ্যতের ইতিহাসের বিষয়। তবে এরপরও শতবর্ষের ইতিহাসে দেশ ও বঙ্গবন্ধুর আনুগত্যের বেদীমূলে তাদের এই রক্তধারা বহমান থাকবে।

৭৫ এর প্রতিবিপ্লবীরা তাদের হত্যা করবে, এটাই স্বাভাবিক। জেলখানার মতো নিরাপদ স্থানে ও আন্তর্জাতিক জেল কোড ভেঙে হত্যা করাও আশ্চর্যের কিছু নয়। কারণ প্রতিবিপ্লবীদের থেকে নিষ্ঠুরতম পথ পৃথিবীতে আর কেউ গ্রহণ করে না। প্রতিবিপ্লবীরা সবসময় পরাজিত শক্তি। এই শক্তি বর্বর ও নিষ্ঠুরতম হয়। পৃথিবীর ইতিহাসের সব প্রতিবিপ্লবই সেই সাক্ষ্য দেয়।
দেশ ও জাতি এই চার নেতাসহ আরও কিছু মুক্তিযুদ্ধের তৎকালীন তরুণ নেতার প্রতি কৃতজ্ঞ হতো, যদি তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিবিপ্লবকে প্রতিহত করার যুদ্ধে বা সংগ্রামে নামতেন। সেখানে তাদের মৃত্যু হলেও ওই মৃত্যু দিবস আর যাই হোক শুধু শোক দিবসের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকতো না। বরং প্রতিবিপ্লবকে প্রতিহত করার সূচনা বা এক ধরনের জয়ধারার দিবস হিসেবে চিহ্নিত হতো।
বাঙালি জাতি সশ্রদ্ধচিত্তে ও অত্যন্ত শোকাতুর হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই চার নেতার মৃত্যু দিবস বা জেলহত্যা দিবসকে পালন করে। স্মরণ করে আমাদের বিশাল মুক্তি সংগ্রামে তাদের নেতৃত্ব ও ত্যাগকে। স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের আনুগত্যকে এবং তার জন্য জীবন উৎসর্গ করাকে। কিন্তু তারা যে বিশ্বমানের নেতা ছিলেন, সে হিসাব করলে ১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লবের পরে তারা যদি ওই প্রতিবিপ্লবকে প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা বাস্তবায়নের জন্য নামতে পারতেন এবং সেজন্য যদি জীবন দিয়ে যেতেন তাহলে তাদের মৃত্যুদিবস শুধু শোকদিবসে সীমাবদ্ধ থাকতো না, জাতির একটি গৌরবের দিবসও হতো। কেন এমনটি হলো না, এ প্রশ্নই শুধু ইতিহাসের পাতা বেয়ে এগিয়ে যাবে না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এমনটি না ঘটার একটি দুঃখও প্রবাহিত হবে।

Print Friendly, PDF & Email