ব্রেকিং নিউজ

ক্লিন ইমেজের নতুন নেতৃত্বে ‘সাজছে’ আ.লীগ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা : সৎ-মেধাবী ও ক্লিন ইমেজের নতুন নেতৃত্ব উপহার দেয়ার মাধ্যমে মূল দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা ঢেলে সাজাবেন ‘নতুন মেজাজে’। একঝাঁক মেধাবী ও ক্লিন ইমেজের ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে আনার মধ্যদিয়ে চমক দেয়ার মূল টার্গেটে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। এরইমধ্যে দলের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও নিবেদিত প্রাণ নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করার ঘোষণা দিয়েছে দলীয়প্রধান।

তবে বাদ দেয়া হচ্ছে বিতর্কিত, হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী-মাদক,ক্যাসিনোর সাথে জড়িত নেতাকর্মীদের। তবে দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অঙ্গকার ব্যক্ত করছেন সাবেক-বর্তমান যুবলীগ, সেচ্ছাসেবকলীগ-কৃষকলীগ ওছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এসব নেতাকর্মীরা বর্তমান সরকারের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের নিয়ে মিছিল-স্লোগানে একদিকে মুখরিত করছেন রাজপথ। আবার অপরদিকে মিছিল-স্লোগানে নিজেদের শক্তির জানান দিচ্ছেন।

এদিকে দীর্ঘদিন পর সম্মেলনের তারিখ ঘোষণায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন-আওয়ামী যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম জাতীয় শ্রমিক লীগে। নতুন কমিটিতে স্থান পেতে বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ। তদবির করছেন নীতিনির্ধারকদের কাছে। তবে বিপাকে রয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত যুবলীগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুকের সমর্থকরা। দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রোববার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে যুবলীগ নেতাদের বৈঠক থেকে তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়।

যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস আয়োজন উপলক্ষে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। তবে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। এ বিষয়ে কথা হয় ক্লিন ইমেজের অন্তত ১০জন নেতারা সাথে। তাদের মধ্যে একজন যুবলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি। তিনি বলেন, আমরা চাই-যোগ্য স্বচ্ছ ও পরিছন্ন ব্যক্তিরা নেতৃত্বে আসুক। সে ক্ষেত্রে নবীন ও অভিজ্ঞদের সমন্বয় থাকলে সংগঠন সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া যায়। সারা জীবন বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আদর্শে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করেছি।

এদিকে, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও চার সহযোগী সংগঠনের আসন্ন কাউন্সিল ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মীদের পদভারে মুখরিত ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। পদ-পদবি টিকিয়ে রাখা এবং প্রত্যাশীদের পদচারণায় প্রতিদিন উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে শোডাউন করছেন সহযোগী সংগঠনের পদপ্রত্যাশীরা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ সভানেত্রীর কার্যালয়ে প্রবেশ এবং কার্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় পদপ্রত্যাশীরা অন্যকে টপকিয়ে নিজেকে শো-আপে মেতে ওঠেন। চলে সেলফির প্রতিযোগিতাও। সেটি জানতে এ মুহূর্তে সবার দৃষ্টি দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে। এ ব্যাপারে তিনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ নানা মাধ্যমে আদ্যোপান্ত খোঁজ নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নেতাদের। এ তথ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতারা জানান, তারুণ্যনির্ভর, ত্যাগী ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতৃত্ব চাচ্ছে দলের হাইকমান্ড। ফলে এই চার সংগঠনের শীর্ষ পদসহ আগামী কমিটি থেকে বাদ পড়তে যাচ্ছেন টেন্ডার ও চাঁদাবাজি এবং ক্যাসিনো পরিচালনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িতরা। পাশাপাশি অন্য দল থেকে এসে সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে যারা বড় পদ বাগিয়ে নিয়েছেন-এমন বিতর্কিত নেতাদেরও জায়গা হবে না নতুন কমিটিতে।

তাদের পরিবর্তে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। বিশেষ করে যুবলীগের শীর্ষ পদে এমন নেতাকেও দেখা যেতে পারে, যিনি সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত নন। তবে আওয়ামী লীগের সাথে তার পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। পাশাপাশি এই সংগঠনে নতুন নেতাদের ক্ষেত্রে বয়সের বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে।

আগামী ১৬ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলন ঘিরে পদপ্রত্যাশীরা তৎপর। কেন্দ্রীয় ও ঢাকার দুই শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে লড়াইয়ে অন্তত এক ডজনেরও বেশি নেতা সম্মেলনকে ঘিরে মাঠ ধাবিয়ে বেড়াচ্ছেন।

তাদের মধ্যে অন্যতম কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান চার সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল হাসান জুয়েল, শেখ সোহেল রানা টিপু, সাজ্জাদ শাকিব বাদশা, সাবেক ছাত্রনেতা সাংবাদিক ওবায়েদুল হক খান ও আবদুল আলীম বেপারী। এর মধ্যে ওবায়েদুল হক খান ১/১১ সময়ে শেখ হাসিনার কারামুক্তি আন্দোলনে সাংবাদিকদের কাছ থেকে গণসাক্ষর অভিযান পরিচালনা করে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। আর টিপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং সাজ্জাদ শাকিব বাদশা সাধারণ সম্পাদক।

চারজনই বিএনপি জামায়াত জোট ও এক এগারো সরকারের আমলে ছাত্রলীগকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সাচ্চু, সহসভাপতি মতিউর রহমান মতি, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন, দফতর সম্পাদক সালে মোহাম্মদ টুটুল কেন্দ্রীয় পদের লড়াইয়ে। তবে বর্তমান কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথের পুনরায় শীর্ষ পদে থাকতে কোনো আপত্তি নেই।

এ বিষয়ে ত্যাগী, স্বচ্ছ ও ক্লিন ইমেজের নেতা খায়রুল হাসান জুয়েল বলেন, সততা, স্বচ্ছতা, কমিটমেন্ট এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে দলের জন্য সব সময় নিয়োজিত রেখেছি। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে ১/১১ এর সময় এক বছর জেল খেটেছি।

তিনি বলেন, যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন তাদেরই নেতৃত্বে আসা দরকার। আমরাও চাই-নেতৃত্ব পাওয়ার প্রধান মানদণ্ড হোক ক্লিন ইমেজ, ত্যাগী মনোভাব, সাংগঠনিক দক্ষতা। তবে আমি মনে করি নেতৃত্বে যেই আসুক, তার যেন অবশ্যই সততা, স্বচ্ছতা, কনট্রিবিউশন এবং কমিটমেন্ট থাকে।

প্রায় এক যুগ পর স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার সম্মেলন আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে। সম্মেলনকে সামনে রেখে গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চের সামনে থেকে মিছিল বের করে মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। পরে মিছিলটি গুলিস্তান ২৩বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সামনে এসে শেষ হয়। মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছছাসেবক লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক। ওয়ান ইলেভেনের পরীক্ষিত এ নেতা আসন্ন কাউন্সিলে ঢাকা মহানগর দক্ষিনের সাধারণ সম্পাদক পদে জোরালোভাবে আলোচনায় আছেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও চান, ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতাদের মধ্যে থেকে মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের মতো যোগ্য ও পরীক্ষিত নেতাকে বেছে নেবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এছাড়াও সংগঠনটির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোরুল ইসলাম বিপুল, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইসহাক মিয়া ও মোহাম্মদপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক বাবু। এর মধ্যে ইসহাক ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি। বিপুল স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহানগরের নেতাদের মধ্যে বেশ সক্রিয়।

এদিকে আগামী ৬ নভেম্বর কৃষক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনকে সামনে রেখে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং আওয়ামী লীগের সভাপতির ধানমণ্ডিস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে নেতাকমীদের ভিড় বেড়েছে। শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় রয়েছেন অনেকে।

তাদেরমধ্যে অন্যতম সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও খান আলতাফ হোসেন ভুলু, কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা। এ ছাড়া সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. হারুনুর রশীদ হাওলাদারও সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য নেতাকর্মীদের মাঝে আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ সমীর চন্দ। সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। এই দেশের কৃষকদের কথা ভেবে জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় রাজনীতি করেছি। রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জেলজুলুম সহ্য করেছি। আশা করছি আমি বিগত দিনের কাজের মূল্যায়ন পাবো।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেন, ত্যাগী ও যোগ্য ব্যক্তিদেরই এবার সুযোগ দেয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই, যাদের বয়স ৫৫-এর বেশি নয়, যারা চাঁদাবাজি, ক্যাসিনোর মতো অবৈধ আয়ের সাথে যুক্ত নন-তারাই কমিটিতে জায়গা পাবেন। তবে বয়স ৫৫ এর বেশি হলে কমিটিতে স্থান পাবেন না।

প্রসঙ্গত, ৬ নভেম্বর কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর জাতীয় শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ২৩ নভেম্বর যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে ২০১২ সালের ১১ জুলাই স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ১৪ জুলাই যুবলীগ এবং ১৯ জুলাই কৃষক লীগের সম্মেলন হয়।

Print Friendly, PDF & Email